স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় নির্বাচনের আগমুহূর্তে রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনা শুধু একটি দলের ওপর হামলা নয়, বরং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংস রাজনীতির পুরোনো সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের বড়াইপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন জামায়াত কর্মী মো. কবির হোসেন, মো. তাজুল ইসলাম, মো. নাজমুল ইসলাম, মুসা মিয়া, সানাউল্লাহ ও মো. ফারুক হোসেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি।
ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক চাপ ও দল পরিবর্তনে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট আজিজুল হকের দাবি, ঘটনার দিন সকালে উচিতপুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন জামায়াত কর্মী কবির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে জামায়াত ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিতে এবং ‘দাঁড়িপাল্লা’র বদলে ‘ধানের শীষ’-এর পক্ষে কাজ করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দুপুরে আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৫০–৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা শুধু ভাঙচুরেই থেমে থাকেনি; বাড়িতে অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি একাধিক হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। নির্বাচনের আগে এমন বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা প্রশাসনের প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার পর জামায়াতের নেতাকর্মীরা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে এবং বিষয়টি থানা পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ইলিয়াস মোল্লা।
তবে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ আলী ভূঁইয়া বিষয়টি সম্পর্কে দায়সারা বক্তব্য দিয়ে বলেন, তিনি এখনো ঘটনাটি জানেন না এবং পরে খোঁজ নিয়ে মন্তব্য করবেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার মতো গুরুতর ঘটনায় এমন বক্তব্য দলীয় দায় এড়ানোর কৌশল কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।
প্রশাসনের ভূমিকাও সমালোচনার মুখে :
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলাউদ্দিন জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হলেও এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। ফলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। যদিও সাধারণত ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতা ও চাপের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ দিতে সাহস পান না—এ বাস্তবতা প্রশাসন কতটা বিবেচনায় নিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—দ্রুত মামলা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আড়াইহাজারের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে নির্বাচন এলেই মাঠ দখল, দল পরিবর্তনে চাপ এবং সন্ত্রাসী কৌশল সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ ভোটাররাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না হলে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হবে—এমন আশঙ্কাই এখন বড় হয়ে উঠছে।









Discussion about this post