নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের একটি মামলার সূত্র ধরে দেশের দুই প্রান্তে পুলিশের তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। একটি ঘটনায় চার বছর পর একটি ডাকাতি মামলার রহস্য উদঘাটন করে ‘সাফল্যের’ গল্প শোনানো হচ্ছে, আরেকটি ঘটনায় একই পিবিআই সদস্যরা আসামি ধরতে গিয়ে জনতার হাতে মারধরের শিকার হলেও সেই বিষয়টি রয়ে গেছে প্রায় নীরবতার আড়ালে।
প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক কাকতাল, নাকি পরিকল্পিতভাবে একটি ঘটনাকে সামনে এনে আরেকটি গুরুতর ব্যর্থতা আড়াল করার কৌশল ?
সৈয়দপুরে পিবিআইয়ের লাঞ্ছনা : উদ্বেগজনক বাস্তবতা
৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) বিকেলে নীলফামারীর সৈয়দপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার একটি প্রতারণা মামলার আসামি মহসিন আলী মন্টুকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়ে পিবিআই। আসামি গ্রেপ্তারের সময় নিজেকে বাঁচাতে ‘ভুয়া ডিবি পুলিশ’ বলে চিৎকার শুরু করলে মুহূর্তেই জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের হামলায় পিবিআইয়ের দুই সদস্য গুরুতর আহত হন, ভাঙচুর করা হয় সরকারি মাইক্রোবাস, আর চোখের সামনেই ছিনিয়ে নেওয়া হয় আসামিকে।
ঘটনাটি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে না, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ভয়ানক বিভ্রান্তির চিত্রও স্পষ্ট করে। অথচ এত বড় ঘটনার পরও পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং, নেই দায় স্বীকার বা ব্যাখ্যা।
চার বছর পর ডাকাত গ্রেপ্তার: হঠাৎই আলোচনার কেন্দ্রে
এর ঠিক ৪ দিন আগে অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি, পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা চার বছর আগে সংঘটিত একটি তেলভর্তি ট্রাক ডাকাতির ঘটনায় একজন আসামিকে গ্রেপ্তারের তথ্য কাউকেই জানান নাই অজ্ঞাত কারণে। ডিবি পুলিশের পরিচয়ে ডাকাতির সেই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া রনি হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন ৪ ফেব্রুয়ারী।
আইনগতভাবে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো—গ্রেপ্তারের দিন ঘটনাটি প্রায় নীরবেই সম্পন্ন হলেও, সৈয়দপুরে পিবিআই সদস্যদের মারধরের ঘটনার পরপরই হঠাৎ করে এই চার বছর পুরোনো মামলাটি জোরালোভাবে সামনে আনা হয়।
পাঠানো হয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি, আয়োজন করা হয় আসামির ফটোসেশন, গণমাধ্যমকর্মীদের অনুরোধ–অনুনয় করে সংবাদ প্রকাশের তৎপরতা দেখা যায়।
ভেতরের ক্ষোভ, বাইরের নীরবতা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“এটা তো একেবারেই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ঘটনা। সৈয়দপুরে আমাদের সদস্যরা মার খেলো, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর হলো, আসামি ছিনতাই হলো—এই বিষয়ে কোনো ব্রিফিং নেই। অথচ চার বছর আগের একটি মামলাকে হঠাৎ করে ফিল্মি কায়দায় সামনে এনে সব ঢাকার চেষ্টা চলছে।”
এই বক্তব্য পিবিআইয়ের ভেতরের অস্বস্তি ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
মূল প্রশ্ন : দায় এড়ানোর কৌশল নাকি জনস্বার্থবিরোধী প্রচারণা ?
একদিকে মাঠপর্যায়ে সদস্যদের নিরাপত্তা, অভিযান পরিচালনার কৌশল ও জনসচেতনতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে; অন্যদিকে সেই ব্যর্থতা আড়াল করতে পুরোনো একটি মামলার সাফল্যকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু পিবিআই নয়, পুরো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
সৈয়দপুরের ঘটনায় দায় কার, ভুল কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যদি শুধু ‘সাফল্যের গল্প’ শোনানো হয়, তবে তা হবে বাস্তবতা আড়াল করারই নামান্তর।
উপসংহার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্য যেমন জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন, তেমনি ব্যর্থতা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতাও স্বীকার করে নেওয়াই পেশাদারিত্বের পরিচয়। নইলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার এই সংস্কৃতি একসময় এমন অবস্থায় নিয়ে যাবে, যেখানে প্রকৃত সমস্যাই ঢাকা পড়ে যাবে প্রচারণার মোড়কে—আর এর মাশুল দিতে হবে মাঠের পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষকেই।
চাইলে আমি এটাকে









Discussion about this post