ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ফলাফল স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি এবং একটি আসনে জামায়াত জোটভুক্ত এনসিপি প্রার্থীর জয়—এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার তুলনায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ শেষে রাতে গণনা সম্পন্ন হয়।
আসনভিত্তিক ফলাফল ও বিশ্লেষণ
নারায়ণগঞ্জ-১
এ আসনে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় পান। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ৬৫ হাজার ভোট বেশি পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে এখানে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দৃঢ় ছিল। ৬৩.৯৬% ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক অংশগ্রহণ নির্দেশ করে।
নারায়ণগঞ্জ-২
ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ প্রায় ৪২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এই আসনেও ভোটার উপস্থিতি (৬৫%) তুলনামূলক ভালো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ফলাফলে স্পষ্ট ব্যবধান রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্র তুলে ধরে।
নারায়ণগঞ্জ-৩
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি। বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নান প্রায় ২০ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয় পান। এখানে ৫৭.৪১% ভোট পড়েছে—যা তুলনামূলক কম। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভোটের ব্যবধান সংকুচিত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪
জেলার একমাত্র ব্যতিক্রমী ফল আসে এই আসনে। এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন জয় পান, যা জামায়াত জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর সঙ্গে ব্যবধান প্রায় ২৫ হাজার ভোট। এই ফল স্থানীয় জোট-রাজনীতির প্রভাব এবং ভোট বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।
নারায়ণগঞ্জ-৫
এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল কাছাকাছি। বিএনপির আবুল কালাম প্রায় ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। ভোটার উপস্থিতি ৫৬.৫১%, যা জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি মূল লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রার্থীগণ কে কত ভোট পেয়েছেন :
🗳 নারায়ণগঞ্জ-১
মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু — ১,৫৬,৩৫৮
আনোয়ার হোসেন মোল্লা — ৯১,৬৯০
মুফতি ইমদাদুল্লাহ হাসেমী — ৭,১৮৬
🗳 নারায়ণগঞ্জ-২
নজরুল ইসলাম আজাদ — ১,২৫,০৬৩
মো. ইলিয়াস মোল্লা — ৮২,৯৮৭
আতাউর রহমান খান আঙ্গুর — ১৮,৯৩৩
🗳 নারায়ণগঞ্জ-৩
আজহারুল ইসলাম মান্নান — ১,৫৫,৪০০
ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া — ১,৩৪,৯১৮
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন — ২০,৩৭৯
🗳 নারায়ণগঞ্জ-৪
আব্দুল্লাহ আল আমিন — ১,০৬,১৭১
মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী — ৮০,৬১৯
মো. শাহ আলম — ৩৯,৫৮৯
🗳 নারায়ণগঞ্জ-৫
আবুল কালাম — ১,১৪,৭৯৯
এবিএম সিরাজুল মামুন — ১,০১,১৯৬
মাকসুদ হোসেন — ৩৪,১৫১
সামগ্রিক চিত্র
জেলার পাঁচটি আসনে মোট ৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ফলাফল বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়—
# বিএনপি জেলার অধিকাংশ আসনে সংগঠিত ও কার্যকর প্রচারণা চালাতে সক্ষম হয়েছে।
# নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ফলাফল প্রমাণ করে, জোটগত সমন্বয় ও স্থানীয় ইস্যু ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
# ভোটার উপস্থিতি ৫৬% থেকে ৬৫% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অংশগ্রহণ সন্তোষজনক হলেও আরও বৃদ্ধি সম্ভব ছিল।
# কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়া ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে, এই ফলাফল নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণই হবে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।









Discussion about this post