স্টাফ রিপোর্টার :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-এর পাঁচটি আসনে মোট ৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাদের মধ্যে ৩৬ জনই বৈধ ভোটের এক-অষ্টমাংশ (১২.৫%) না পাওয়ায় জামানত হারিয়েছেন। সংখ্যাটা শুধু পরাজয়ের নয়—এটা রাজনৈতিক প্রভাব, সাংগঠনিক শক্তি ও জনভিত্তির বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
নির্বাচনী আইনে স্পষ্ট—বৈধ ভোটের ১২.৫ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত। সেই হিসাবেই এবার অনেক ‘হেভিওয়েট’ পরিচয়ে মাঠে নামা নেতাও ভরাডুবির তালিকায়।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ)
৭ প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন জামানত হারিয়েছেন।
মোট বৈধ ভোট: ২,৫৬,৩৮৪
১২.৫% = ৩২,০৪৮ ভোট
ট্রাক, জাহাজ, হাতপাখা, কাস্তে, আপেল—বিভিন্ন প্রতীকের প্রার্থীরা কেউই নির্ধারিত সীমা ছুঁতে পারেননি। ভোটের হিসাবে কারও প্রাপ্তি কয়েকশ, কারও কয়েক হাজারে থেমেছে। প্রশ্ন উঠছে—মাঠে কর্মী ছিল, কিন্তু ভোট কোথায় গেল?
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার)
৫ জন প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
মোট বৈধ ভোট: ২,৩০,০৭৩
১২.৫% = ২৮,৭৫৯ ভোট
এখানেও বেশ কয়েকজন আলোচিত প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট তুলতে ব্যর্থ। কেউ ১৮ হাজারে আটকে গেছেন, কেউ কয়েকশ ভোটে সীমাবদ্ধ। “হেভিওয়েট” তকমা থাকলেও ব্যালটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ)
১১ জনের মধ্যে ৯ জন জামানত হারিয়েছেন।
মোট বৈধ ভোট: ৩,৩২,৮৫২
১২.৫% = ৪১,৬০৭ ভোট
এ আসনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। ২০ হাজার বা ১৪ হাজার ভোট পেলেও সীমা ছোঁয়া যায়নি। আবার কারও ভোট তিন অঙ্কেই সীমাবদ্ধ। সংগঠন, প্রচার আর বাস্তব জনসমর্থনের ফারাক এখানে স্পষ্ট।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা)
১৩ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন জামানত হারিয়েছেন।
মোট বৈধ ভোট: ২,৬২,৭২৯
১২.৫% = ৩২,৮৪১ ভোট
এখানে বেশ কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখও সীমা পেরোতে পারেননি। কেউ ১৬ হাজার, কেউ ১১ হাজার, আবার কেউ হাজারের নিচে ভোট পেয়েছেন। বড় বড় বক্তব্য আর মাঠের বাস্তবতার ব্যবধান যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই ফলাফল।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর)
১০ প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন জামানত হারিয়েছেন।
মোট বৈধ ভোট: ২,৬৬,৩৫৭
১২.৫% = ৩৩,২৯৫ ভোট
এ আসনেও চিত্র প্রায় একই। কয়েক হাজার ভোট পেয়েও অনেকে নির্ধারিত সীমায় পৌঁছাতে পারেননি। কেউ আবার এক হাজারেরও কম ভোট পেয়েছেন—যা রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনায় বিব্রতকর বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হেভিওয়েট তকমা বনাম ভোটের বাস্তবতা
নির্বাচনের আগে মিছিল, পোস্টার, শোডাউন—সবই ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ভোটের বাক্সে সেই ‘প্রভাব’ অনুপস্থিত। অনেকেই দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয়, কেউ কেউ নিজেদের এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। তবু বাস্তবতা হলো—জনসমর্থন কাগজে-কলমে নয়, ব্যালটে প্রমাণিত হয়।
জামানত হারানো মানে শুধু অর্থ হারানো নয়; এটা রাজনৈতিক বার্তা। ভোটাররা যেন বলেছে—শুধু পরিচিতি বা উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য নয়, গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা চাই।
গঠনমূলক প্রশ্ন
# দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল রাজনীতি কি জনভিত্তি হারাচ্ছে?
# তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ কতটা বাস্তব, আর কতটা কাগুজে?
# ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার কি আদর্শভিত্তিক রাজনীতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে?
নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিল—নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা নীরব থাকলেও সিদ্ধান্তে কঠোর। ‘হেভিওয়েট’ পরিচয় নয়, কার্যকর জনসম্পৃক্ততাই শেষ কথা।
রাজনীতির মাঠে এটা সতর্কবার্তা: জনপ্রিয়তার দাবি করা সহজ, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জনই আসল চ্যালেঞ্জ।








Discussion about this post