নিজস্ব প্রতিনিধি :
পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে ১৮ ফেব্রুয়ারি। এই মাসকে সামনে রেখে যখন সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মুড়ির কারখানাগুলোতে চলছে কথিত এক ভয়ংকর প্রতিযোগিতা—কে কত বেশি উৎপাদন করবে, আর সেই উৎপাদনে কী মিশছে, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
জোড়ালো অভিযোগ রয়েছে, জেলার প্রায় ২৫-৩০টি কারখানায় রমজানের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে মুড়ি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হাইড্রোস ও ইউরিয়া সার। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ চুরির মাধ্যমেও কম খরচে অধিক মুনাফা অর্জনের অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারী।
“ম্যানেজ” সংস্কৃতি: আইনের চোখ বেঁধে দেওয়ার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারখানা শ্রমিক দাবি করেছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কিছু অসাধু সদস্যকে আগাম ঘুষ দিয়ে “ম্যানেজ” করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ছাড়াও থানার ওসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে নগদ অর্থ ও বিনামূল্যে মুড়ি সরবরাহের কথাও উঠে এসেছে অভিযোগে। এমনকি ভোক্তা অধিকার ও গোয়েন্দা সংস্থার নাম ব্যবহার করে আগাম যোগাযোগ ও সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়ার কথাও শোনা গেলেও আসলে কাজর কাজ কিছুই করে নাই কোন সংস্থা। যার কারণে এরই মধ্যে বিষাক্ত মুড়ি উৎপাদন করে বাজারজাত করতে নগরীর পাইকারী বাজার নিতাইগঞ্জ থেকে দেশের সর্বত্র বিক্রি সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এই বিষয়ে কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ভ্রুক্ষেপও করে নাই এতো বড় ধরণের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে পুরো জেলাজুড়েই। তবে চুক্তি মোতাবেক ঘুষ লেনদেন করতে অসাধু চক্রের হাত পিছিয়ে থাকে নাই।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, আড়াইহাজার, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ এলাকার কিছু কারখানায় দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অনিয়ম চলছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি—গত বছরও এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে ব্যবসা
রমজানে ইফতারের টেবিলে মুড়ি এক অনিবার্য উপাদান। সেই আবেগ ও চাহিদাকে পুঁজি করে যদি খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়, তবে তা কেবল ভোক্তা প্রতারণাই নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। ইউরিয়া সার বা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যে মেশানো হলে তা কিডনি, লিভার ও অন্যান্য অঙ্গের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তবে এটি শুধু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর লোভ নয়—বরং একটি সংগঠিত দুর্নীতির চক্র, যেখানে উৎপাদক থেকে তদারককারী পর্যন্ত কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারেন।
প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
প্রশ্ন উঠছে—বারবার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও কেন কার্যকর অভিযান নেই ? কেন কোনো কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি ? কেন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায় না ?
যদি সত্যিই ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে তদারকি সংস্থাগুলোকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়ে থাকে, তবে তা আইনের শাসনের জন্য চরম হুমকি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা
# রমজানকে সামনে রেখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি—
# অভিযুক্ত কারখানাগুলোতে হঠাৎ ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা
# উৎপাদিত মুড়ির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ
# গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব অডিট
# ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত
# দোষী প্রমাণিত হলে কারখানা সিলগালা ও লাইসেন্স বাতিল
রমজান আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। সেই মাসকে পুঁজি করে যদি সাধারণ মানুষের শরীরে বিষ ঢোকানো হয়, তবে তা শুধু আইন ভঙ্গ নয়—নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। প্রশাসন যদি এখনো কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে জনগণের আস্থা চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জনস্বার্থে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা—এটাই এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post