নিজস্ব প্রতিবেদক :
সোনারগাঁ-এ অবৈধ বালু উত্তোলন: নির্দেশনা অমান্য করে সংঘর্ষ, ভাঙনের শঙ্কায় মেঘনাতীর
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বৈদ্যের বাজার ইউনিয়ন এলাকায় মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগকে ঘিরে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান-এর নাম ব্যবহার করে একটি চক্র দিন-রাত ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। তবে সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংঘর্ষ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ
অভিযোগ ওঠার পর এলাকাবাসীর সুবিধার্থে পুলিশ হস্তক্ষেপ করলে এমপি মান্নানের নির্দেশে ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
কিন্তু পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পুনরায় বালু উত্তোলন শুরু হলে এলাকাবাসীর সঙ্গে ড্রেজার পরিচালনাকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতেও পুনরায় ড্রেজার বসানোর চেষ্টা হলে সোনারগাঁ থানা পুলিশ ও বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল মামুন এলাকাবাসী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে তা বন্ধে উদ্যোগ নেন। এ সময়ও কয়েক দফা উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন করে আসছে।
বর্তমানে অধ্যাপক রেজাউল করিমপন্থী বিএনপি নেতা ইয়াসিন নোবেলের নেতৃত্বে এ কার্যক্রম চলছে বলে তারা দাবি করেন।
আরো অভিযোগ রয়েছে, দিনে ও রাতে ১০-১২টি ড্রেজার বসিয়ে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
তবে বৈদ্যের বাজার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, “দলের নাম ব্যবহার করে কোনো অপকর্মকে বিএনপি প্রশ্রয় দেয় না। বিষয়টি প্রশাসনের মাধ্যমে আইনগতভাবে দেখা উচিত।”
অন্যদিকে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ইয়াসিন নোবেল দাবি করেন, আমান সিম কোম্পানির জাহাজ ভেড়ানোর জন্য ড্রেজিংয়ের অনুমোদন রয়েছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন।
অনুমোদন ও আইনি অবস্থান
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA)-এর মেঘনাঘাট নদীবন্দরের উপ-প্রকৌশলী এস এম আলী রেজা জানান, আমান সিম কোম্পানির জেটি নির্মাণের জন্য সীমিত ড্রেজিংয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বালু বিক্রির কোনো অনুমোদন নেই। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নদীভাঙনের ঝুঁকি
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা তীরবর্তী গ্রামগুলোকে মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। ইতোমধ্যে খাসেরচর, ভুরভুরিয়া, ভাটিবন্দর ও সুলতাননগর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। মালিগাঁও, হাড়িয়া, গোবিন্দী হাড়িয়া, বৈদ্যেপাড়া ও সোনামুইসহ আরও কয়েকটি গ্রাম এবং মেঘনাতীরবর্তী আমান ইকোনমিক জোন বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠন ব্যাহত হয়, যা ভাঙন, নৌপথের অস্থিতিশীলতা এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
উপসংহার
সোনারগাঁয়ের বৈদ্যের বাজার এলাকায় বালু উত্তোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনুমোদিত ড্রেজিং ও অবৈধ বাণিজ্যিক উত্তোলনের পার্থক্য স্পষ্ট করে স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগই এখন স্থানীয়দের প্রধান প্রত্যাশা।









Discussion about this post