নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ: রমজানের প্রথম সেহেরীর রাত—যে সময়টা আনন্দ, প্রস্তুতি আর ইবাদতের আবহে কাটার কথা, সেই সময়েই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলা নিভে যায়, রান্না থেমে যায়, আর অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় সেহেরীর আয়োজন।
মধ্যরাতে রেস্টুরেন্টে ভিড়
মধ্যরাত পেরোতেই শহরের ডন চেম্বার এলাকা থেকে বের হয়ে খাবারের খোঁজে রাস্তায় নামেন ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন। কালির বাজার দুই নম্বর গেট, নিতাইগঞ্জ, কাচারি গলি—বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় তখন উপচে পড়া ভিড়। সেহেরীর জন্য ভাত ও তরকারি কিনতে ছুটছেন অসংখ্য মানুষ। রাত ১টার আগেই অনেক হোটেলে খাবার ফুরিয়ে যায়।
অনেকের অভিযোগ, দুপুর থেকেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রাত ১০টার মধ্যে স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও রাত ১২টা পর্যন্তও সরবরাহ চালু হয়নি।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল থেকে গলাচিপা, আমলাপাড়া, খানপুর, মিশনপাড়া, মাসদাইর, দেওভোগসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস বন্ধ ছিল বলে বাসিন্দারা জানান।
আমলাপাড়ার গৃহিণী পারভীন বলেন, “রমজানের প্রথম রাত, অনেক আয়োজন করে রান্না শুরু করেছিলাম। হঠাৎ দুপুরে গ্যাস চলে গেল।”
নিতাইগঞ্জ কাচারি গলি এলাকার গৃহবধূ নাজমা মান্নান জানান, “সকালে চাপ কম ছিল, দুপুরের পর থেকে চুলা একদম জ্বলছে না। রাত ১২টা পেরিয়ে গেল, সেহেরীর রান্নার কোনো উপায় নেই।”
সংস্কারকাজের ব্যাখ্যা, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড–এর ফতুল্লা শাখার এক টেকনিশিয়ানের দাবি, ফতুল্লার পঞ্চবটী এলাকায় প্রধান সিএনজি স্টেশনের কাছে মূল পাইপলাইনে সংস্কারকাজ চলছিল।
বিষয়টি ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছিল এবং দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—রমজানের প্রথম রাতের মতো স্পর্শকাতর সময়ে কেন এমন সংস্কারকাজ ?
মাঠপর্যায়ে কি যথাযথভাবে মাইকিং, এসএমএস বা গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছিল ? শুধু ওয়েবসাইটে নোটিশ প্রকাশ করলেই কি দায়িত্ব শেষ?
প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি ?
গ্যাস সরবরাহ একটি মৌলিক সেবা। ধর্মীয় গুরুত্ববহ সময়ে এ ধরনের বিঘ্ন নাগরিক জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। পরিকল্পনা, সময় নির্বাচন এবং জনসচেতনতা—এই তিন ক্ষেত্রে ঘাটতির অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। অনেকেই বলছেন, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার কোনো দিকনির্দেশনা বা জরুরি সহায়তা সেল চালু করা হয়নি।
গঠনমূলক সুপারিশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে—
# রমজান-পূর্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ সূচি সমন্বয় করা জরুরি।
# এসএমএস অ্যালার্ট, মাইকিং ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা নিশ্চিত করতে হবে।
# জরুরি হটলাইন ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় রাখতে হবে।
# কাজের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ধর্মীয় বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সময় বিঘ্নিত না হয়।
রমজানের প্রথম রাতে সেহেরী থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা—এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং পরিকল্পনা ও জনসম্পৃক্ততার ঘাটতির প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অনেকে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং দায় নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্তই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা।








Discussion about this post