বিশেষ প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০ ফেব্রুয়ারি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে স্মরণ করা হয় দুই ভিন্ন ধারার রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—একেএম শামসুজ্জোহা এবং হাজী জালাল উদ্দিন আহমেদ-কে। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তাঁদের মৃত্যু নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, যার প্রভাব এখনো বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক অবদান
নারায়ণগঞ্জে দলীয় রাজনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একেএম শামসুজ্জোহা ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর এক নিবেদিত সংগঠক। স্থানীয় পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করা, কর্মী গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে তার ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট।
অন্যদিকে হাজী জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন শহরভিত্তিক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠকদের একজন। দলীয় কাঠামো দাঁড় করানো এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
দুইজনই নিজ নিজ রাজনৈতিক আদর্শে দৃঢ় থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনভিত্তিক রাজনীতির যে ধারা তারা তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
উত্তরাধিকার ও পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাব
এই দুই নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে।
একেএম শামসুজ্জোহার পরিবারের মধ্যে থেকে উঠে আসা নাসিম ওসমান, শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমান জাতীয় সংসদে একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাদের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
অন্যদিকে হাজী জালাল উদ্দিন আহমেদের ছেলে আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
বিশ্লেষণ : ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে প্রভাববলয়
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই দুই পরিবারের উত্থান একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে—স্থানীয় রাজনীতি অনেকাংশে ব্যক্তি নির্ভরতা থেকে পরিবারকেন্দ্রিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে,
# রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অবদান ছিল মূল ভিত্তি
# তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ভিত্তি পরিবারভিত্তিক প্রভাববলয়ে রূপ নিয়েছে
# এতে দলীয় রাজনীতির বিকাশ যেমন হয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের প্রশ্নও উঠে এসেছে
সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, এই দুই নেতার জীবন ও কর্ম মূল্যায়ন শুধু স্মরণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—স্থানীয় রাজনীতি কি আদর্শভিত্তিক থাকবে, নাকি পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাবই প্রধান হয়ে উঠবে ?
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখনও এই দ্বৈত প্রবণতা বিদ্যমান। একদিকে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিক ক্ষমতার কাঠামো—দুটির মধ্যকার টানাপোড়েন স্পষ্ট।
উপসংহার
২০ ফেব্রুয়ারি কেবল দুই নেতার মৃত্যুবার্ষিকী নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি প্রতীকী দিন। একেএম শামসুজ্জোহা এবং হাজী জালাল উদ্দিন আহমেদ-এর অবদান, তাদের গড়ে তোলা সংগঠন এবং উত্তরসূরিদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের গল্প।
এই প্রেক্ষাপটে, তাদের জীবন ও আদর্শ পুনর্মূল্যায়নই হতে পারে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।









Discussion about this post