বিশেষ প্রতিবেদক :
দিনভর নাটকীয়তার পর দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে পরিবর্তন—এই ঘটনাকে ঘিরে অর্থনীতি, নীতি-নির্ধারণ ও রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের সন্তান মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ ঘিরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন তার অতীত আর্থিক অবস্থান ও বিতর্কিত ঋণ ইতিহাস।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষে
নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের পাকুন্দা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি পোশাক খাত, করপোরেট ফিন্যান্স এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকলেও তার উত্থান এবার সরাসরি দেশের আর্থিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
তিনি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা “হেরা সোয়েটার্স”-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়ভাবে তার পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে, যা নিয়োগটিকে আরও বেশি আলোচিত করে তুলেছে।
রেওয়াজ ভেঙে বিতর্কিত নিয়োগ
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে অনেকে “নীতিগত বিচ্যুতি” হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্ন উঠছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি পেশাগত ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, নাকি ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ?
ঋণ পুনঃতফসিল: আইনি স্বস্তি, নৈতিক প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার ঋণ ইতিহাস নিয়ে। তথ্য অনুযায়ী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক-এ তার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৯ কোটি টাকা।
যদিও গত বছর বিশেষ সুবিধায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, ফলে আইনগতভাবে তাকে এখন “ঋণখেলাপি” বলা যাচ্ছে না—তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে:
# সাধারণ গ্রাহক কি এমন সুবিধা পান?
# কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে একজন
# পুনঃতফসিলকৃত বড় ঋণগ্রহীতার নিয়োগ কতটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ?
# এতে কি ব্যাংকিং খাতে “মেসেজ” যাবে যে প্রভাব থাকলে দায়মুক্তি সম্ভব ?
এখানেই মূল বিতর্ক—আইনি বৈধতা বনাম নৈতিক দায়বদ্ধতা।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
নতুন গভর্নরের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও আলোচনায় এসেছে। তিনি জাতীয় নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন—যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলছে।
নারায়ণগঞ্জে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
স্থানীয়ভাবে নারায়ণগঞ্জে এই নিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
একদিকে :
# “আমাদের এলাকার মানুষ দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান”—এই গর্ব
অন্যদিকে:
# ঋণ বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষ করে সোনারগাঁ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন—“যার নিজের ঋণ পুনঃতফসিল করতে হয়েছে, তিনি কীভাবে দেশের ব্যাংকিং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবেন ?”
অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য বার্তা
এই নিয়োগ দেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে :
# বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতিগত নমনীয়তা কি বাড়বে ?
# ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রাধান্য—কোনটি জোরদার হবে ?
# কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে ?
উপসংহার
মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। তার দীর্ঘ করপোরেট অভিজ্ঞতা একদিকে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু ঋণ পুনঃতফসিল, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং পেশাগত প্রেক্ষাপট—এই তিনটি বিষয় তার নেতৃত্বকে শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে ফেলেছে।
নারায়ণগঞ্জের মাটির সন্তান হিসেবে তার এই উত্থান যেমন গর্বের, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা—তিনি কি নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে তুলে একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবেন, নাকি এই নিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।









Discussion about this post