স্টাফ রিপোর্টার | নারায়ণগঞ্জ
যমুনা অয়েল কোম্পানি-এর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া চার লাখ লিটার জ্বালানি তেল গায়েবের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে—তেলচুরির মূল হোতা হিসেবে পরিচিত জয়নাল আবেদীন টুটুলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটই পুরো ডিপো নিয়ন্ত্রণ করছে, যার প্রভাবেই কার্যত স্থবির হয়ে আছে ব্যবস্থা গ্রহণ।
তদন্তে গঠিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কমিটি গত ১১ ডিসেম্বর তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে ২৫টি পর্যবেক্ষণ ও ১৩টি সুপারিশ থাকলেও বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, টুটুল সিন্ডিকেটের প্রভাব ও অর্থের জোরেই এই নিষ্ক্রিয়তা।
টুটুল সিন্ডিকেট: প্রভাব, ঘুষ আর নিয়ন্ত্রণের জাল
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফতুল্লা ডিপোর গেজার ও সিবিএ নেতা জয়নাল আবেদীন টুটুলকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে, যারা ডিপোর প্রায় সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। অভিযোগ রয়েছে—ডিপোর সিসিটিভি ক্যামেরার পাসওয়ার্ড পর্যন্ত টুটুলের নিয়ন্ত্রণে, এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বসেই তিনি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সূত্র জানায়, এই সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে প্রতি মাসে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ঘুষ বিতরণ করা হয়। এর বাইরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কুখ্যাত ডাকাতখ্যাত মোহাম্মদ আরী ও তার ভাতিজা রিপন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত ‘মাসোয়ারা’ দেওয়া হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই কার্যত এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
রাজনৈতিক – প্রশাসনিক ও সন্ত্রাসীদের নিয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট নিয়ে গড়া টুটুলের এই বিশাল চোরাই তেলের সাম্রাজ্য অবিরামপন্থায় চলমান থাকায় নিয়মিত এই চুরির ভাগবাটোয়ারা প্রত্যেকটা টেবিলে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে। টুটুলের মোবাইল ট্রাকিং ও তার অন্যান্যা মোবাইল নাম্বারের বিকাশ লেনদেনের তথ্য যাচাই করলে বেড়িয়ে আসবে লোমহর্ষক সিন্ডিকেটের রমরমা চিত্র। এমন তুঘলকি কর্মকাণ্ড সচল রাখতেই টুটুল সিন্ডিকেট নানানভাবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের শুরু করে ডিপোর গেটের সিকিউরিটি গার্ড কে পর্যন্ত নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে তুষ্ট রাখে।
টুটুলের নিয়ন্ত্রিত বিশাল সিন্ডিকেট পরিচালনা করতে প্রতিমাসে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় নিয়মিত। আর নারায়ণগঞ্জের বিশেষ পেশার কয়েকজন নামধারীর মাধ্যমে প্রতিমাসে দেড় লক্ষ টাকার উপরে মাসোয়ারা দিয়ে তুষ্ট রাখে এই টুটুল।
ফলে টুটুলের পক্ষে দুদকের একজন কর্মকর্তা ও কয়েকজন কর্মচারী, জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের একজন কর্মকর্তা, ফতুল্লা থানার ওসি (বদলি হয়ে যিনি আসেন তার সাথেই গড়ে তোলেন সখ্যতা) এবং রাজনৈতিক দলের কয়েকজন প্রভাবশালী যেমন বিগত সময়ে আজমেরী ওসমান ও বর্তমানে জাকির খানের নাম ব্যবহার করে এবং কোন কোন নেতাকে তুষ্ট রেখেই ডিপোর বাইরে থেকেই ক্লোজ সাকিট ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করে চালিয়ে যাচ্ছে চোরাই তেলের সাম্রাজ্য।
বিএনপির কারামুক্ত নেতা জাকির খানকে কোটি টাকা ব্যায়ে গাড়ি উপহার দিয়ে টুটুল তার সাম্রাজ্য ঠিক রেখেছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে ।
এতো কিছুর পরও বিপিসির তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফতুল্লা ডিপোর গেজার (তেল পরিমাপক) ও সিবিএর কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন টুটুলের ডিপো নিয়ন্ত্রণের তথ্য। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, টুটুলকে কেন্দ্র করে ফতুল্লা ডিপোতে একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের মাধ্যমে ফতুল্লা ডিপোর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ ই আগস্ট এর পর থেকে তেলচুরির গডফাদার এই টুটুলকে ডিপোর ভিতরে তেমন একটা দেখা না গেলেও তার নির্দেশনা ছাড়া ডিপোর ভিতরের একটি গাছের পাতাও পরিষ্কার করা হয় না। ডিপোর ভিতরে কয়েকটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে টুটুলের হাতে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ঢাকা নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে এই গডফাদার টুটুল ডিপোর সাম্রাজ্য সার্বক্ষনিক নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। বিশাল এই তেল চুরির সামান্য সামান্য অংশ ডিপোতে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে বিতরণ করায় সকলেই টুটুলের কাছে জিম্মি। অর্থাৎ ঘুষ ও চুরি নামক এই ময়লার গন্ধ সকলের গায়ে মেখে দেয়ায় কেউ আর মুখ খুলতে সাহস করে না । এমন মন্তব্য ডিপোতে কর্মরত একজন কর্মচারীর।
তদন্তে উঠে এলো ভয়াবহ অনিয়ম
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংক-২২ ও ২৩-এ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ক্যালিব্রেশন চার্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট ক্যালিব্রেশন প্রতিষ্ঠান ও ডিপোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
ক্যালিব্রেশন প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কর্ণধার আবুল মনজুর তদন্ত কমিটিকে জানান, “ক্যালিব্রেশন ত্রুটির পেছনে কারও স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।”
এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরিয়ান ট্রেডিং এবং সংশ্লিষ্ট ক্যালিব্রেটরদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, সংশোধিত ক্যালিব্রেশন চার্ট ডিপোর কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তৈরি করা হয়েছে।
সুপারিশ: বদলি, শাস্তি ও কাঠামোগত সংস্কার
কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে, যার মধ্যে রয়েছে—
# টুটুলসহ সংশ্লিষ্ট গেজার ও মিটারম্যানদের ধাপে ধাপে বদলি
# ডিপো সুপারসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা
# ত্রুটিপূর্ণ ক্যালিব্রেশনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
# নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও নজরদারি জোরদার
# পাইপলাইন লোকসান নিরূপণে পৃথক কমিটি গঠন
কমিটি আরও উল্লেখ করে, যমুনা অয়েলের লোকসানের হার (০.৯৫%) অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি, যা বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশ্নের মুখে নীরবতা
তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অস্পষ্ট। যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বলেন, “এজিএম নিয়ে ব্যস্ত আছি, পরে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে বিপিসির পরিচালক ড. এ কে এম আজাদুর রহমান জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদে বড় ধাক্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতের এমন দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। অভিযোগ অনুযায়ী, টুটুল সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত চক্রের মাধ্যমে এই তেলচুরি চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ঘুষ ও প্রভাবের জালে আটকে পড়েছে পুরো ব্যবস্থাপনা।
উপসংহার
ফতুল্লা ডিপোর এই ঘটনা শুধু একটি চুরির ঘটনা নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি। তদন্তে সবকিছু স্পষ্ট হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তা রাষ্ট্রের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কি টুটুল সিন্ডিকেটের প্রভাব ভেঙে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, নাকি এই চক্রই থেকে যাবে অপ্রতিরোধ্য।









Discussion about this post