মহানগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপো ঘিরে বহুল আলোচিত অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় অবশেষে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলো যমুনা অয়েল কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। মিটার অপারেটর মো. আবুল হোসেন, কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ এয়াকুব এবং গেজার জয়নাল আবেদীন ওরফে টুটুল—এই তিন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের গুরুতর অভিযোগে দুইজন কারাগারে থাকলেও টুটুল কীভাবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে ?
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, আবুল হোসেন ইতোমধ্যে একটি ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। একইভাবে ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন এয়াকুব। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও জয়নাল আবেদীনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি—যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়া এবং কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করেই টুটুল প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আইন সবার জন্য সমান—এই মৌলিক নীতিই যেন এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।
দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ
জয়নাল আবেদীন ও এয়াকুবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অনিয়ম, তেল চুরি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দুটি পৃথক কমিটি গঠন করেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তেল চুরির মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে বিপুল সম্পদের পাহাড়। কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে জমি-ফ্ল্যাট, পরিবহন ব্যবসায় বিনিয়োগ, এমনকি জাহাজ ও ট্যাংক-লরি মালিকানার অভিযোগও রয়েছে টুটুলের বিরুদ্ধে।
‘ব্রাজিল বাড়ি’ থেকে বিলাসী জীবন
২০১৮ সালের FIFA World Cup 2018 চলাকালে আলোচনায় আসে টুটুলের তথাকথিত ‘ব্রাজিল বাড়ি’। ফতুল্লায় নির্মিত ছয়তলা বাড়িটি ব্রাজিলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে তিনি নজর কাড়েন। সেই সময় ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতও বাড়িটি পরিদর্শন করেন—যা তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—একজন গেজার পদে চাকরি করে কীভাবে এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব ?
অন্যদিকে এয়াকুবের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সামান্য বেতনের চাকরি করেও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় বিশাল ফ্ল্যাটে বসবাস, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে তার আয়-ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৈষম্য স্পষ্ট।
আইনের প্রয়োগে দ্বৈত মান ?
একই ধরনের অভিযোগে আবুল হোসেন ও এয়াকুব গ্রেপ্তার হলেও টুটুল এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—এটি নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও উঠছে গুরুতর অভিযোগ। যদি একজন আসামি প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে আইনের শাসন কোথায় দাঁড়ায় ?
জনমনে ক্ষোভ, গ্রেপ্তারের দাবি জোরদার
সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—কেন একজন আসামি এখনো অধরা? কেন একই অপরাধে ভিন্ন আচরণ ?
দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং টুটুলকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে। অন্যথায় এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে দেবে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।









Discussion about this post