নিজস্ব প্রতিবেদক :
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, বিয়ের প্রলোভন ও প্রতারণার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিলন কুমার হাওলাদারকে ক্লোজড (পুলিশ লাইনে সংযুক্ত) করার ঘটনায় জনমনে স্বস্তি ফিরেছে—আর এই পদক্ষেপের জন্য সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সন্ধ্যায় তাকে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবের বলয়ে থাকা এক বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সহজ ছিল না—কিন্তু পুলিশ সুপারের দৃঢ়তা সেই কঠিন কাজটিই সম্ভব করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ভাঙ্গা উপজেলা এলাকায়। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ—মামলার তদন্তের সূত্রে পরিচয়ের পর এসআই মিলন কুমার বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, পরে প্রতারণার মাধ্যমে গর্ভপাত করান এবং তাকে নানা হুমকি দেন। অভিযোগগুলো শুধু নৈতিক বিচ্যুতি নয়—এগুলো স্পষ্ট অপরাধ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অভিযোগ ওঠার পরও অভিযুক্তকে আটক করে আবার রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে করে পুলিশের ভেতরে একটি অদৃশ্য ‘প্রভাব বলয়’ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি কতটা গভীরে প্রোথিত—তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
“ক্যাশিয়ার” নামের আড়ালে অপকর্মের সাম্রাজ্য
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, মিলন কুমার হাওলাদার দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘সেকেন্ড অফিসার’ ও ওসির ঘনিষ্ঠ ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে একটি অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন। এই পরিচয়ের জোরে তিনি শুধু প্রশাসনিক প্রভাবই বিস্তার করেননি, বরং নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েও পার পেয়ে গেছেন।
কোথাও কোন নির্দিষ্ট ডিউটি না করলেও থানায় বসে নিজেকে সেকেন্ড অফিসার ও ক্যাশিয়ার পরিচয় দিয়ে নগরীর অপরাধীদের নানাভাবে শেল্টার নিয়ে উৎকোচ আদায়ে ছিলেন অত্যান্ত পারদর্শী ।
প্রশ্ন উঠছে—একজন উপ-পরিদর্শক কীভাবে ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন ? এই পরিচয় কি কোনো বৈধ পদ, নাকি এটি দুর্নীতি ও অনিয়মের একটি নিরাপদ আড়াল ?
পুলিশের ভেতরের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, ‘ক্যাশিয়ার’ ট্যাগ ব্যবহার করে কিছু অসাধু সদস্য দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার, অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো—এসব যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ সুপারের দৃঢ়তায় ভাঙল নীরবতা
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী-এর পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগগুলো ধামাচাপা পড়ছিল, সেখানে তিনি প্রশাসনিক সাহস দেখিয়ে অভিযুক্তকে প্রত্যাহার করেছেন। এটি শুধু একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়—বরং পুলিশের ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু ক্লোজড করাই যথেষ্ট নয়। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলার আওতায় আনা জরুরি।
এখনই সময় শুদ্ধি অভিযানের
এই ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে—কিছু অসাধু সদস্যের কারণে পুরো বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিশেষ করে ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত এই অস্বচ্ছ ক্ষমতার বলয় ভেঙে না দিলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সুশীল সমাজের দাবি—
# ‘ক্যাশিয়ার’ নামে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে
# অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
# থানাভিত্তিক অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রগুলো চিহ্নিত করে ভেঙে দিতে হবে
শেষ কথা
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী-এর সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপ অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে এই উদ্যোগকে পূর্ণতা দিতে হলে এখন প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান বিচারিক পদক্ষেপ।
কারণ, জনগণের প্রত্যাশা একটাই—
“শুধু বদলি নয়, অপরাধের বিচার চাই।”









Discussion about this post