নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ফতুল্লাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অন্যতম বিতর্কিত মুখ বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ঝুট ব্যবসা, ভূমিদস্যূতা, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে বহু বছর ধরে আলোচিত এই ব্যবসায়ীকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিনকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার পালাবদল হলেও কি নারায়ণগঞ্জে সেই পুরোনো প্রভাবশালী বলয়ই বহাল রয়েছে ?
স্থানীয় রাজনৈতিক মহল বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলয় থেকেই হাতেমের উত্থান। শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ ওই পরিবারের প্রভাবকে ব্যবহার করে রাতারাতি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ওসমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পুরনো অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের সাথে হাতেমের সম্পর্ক নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে তাদের সঙ্গে তার দহরম-মহরম ছিল প্রকাশ্য বিষয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
সেই সময় ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক শিল্প এলাকাকে কেন্দ্র করে ঝুট ব্যবসার বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্ককে ঘিরেই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয়, যার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন হাতেম ও তার অনুসারীরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময় শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসা, পরিবহন ও শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করেন তিনি।
ক্ষমতা বদল, কিন্তু বদলায়নি কৌশল
ক্ষমতার পালাবদলের পরও হাতেমের অবস্থান খুব একটা নড়বড়ে হয়নি বলেই অভিযোগ উঠছে। বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত অবস্থান বদলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি—এমন অভিযোগ করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
সম্প্রতি রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের এক ইফতার মাহফিলে সরকারের এক মন্ত্রীর পাশে বসে তোলা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি প্রকাশ্য বার্তা।
এমপি অবরুদ্ধের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক সময়ে ফতুল্লার বিসিক শিল্প এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন সেখানে গেলে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে রাত আটটার দিকে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
ঘটনায় সংঘর্ষে অন্তত কয়েকজন আহত হন। তাদের মধ্যে এনসিপির শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক ফয়সাল আহমেদ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক শওকত আলী অভিযোগ করেন,
“সংসদ সদস্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার সময় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় হাতেমের অনুসারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।”
জুলাই আন্দোলন নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য
এদিকে সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন অভিযোগ করেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে হাতেম আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,
“দেশে হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন। সেই সময় তিনি আন্দোলনকে ‘তাণ্ডব’ বলেছেন। এখন তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে—এটি কি বাধ্য হয়ে বলেছেন, নাকি সেটিই তার প্রকৃত অবস্থান।”
বিক্ষোভে উত্তাল নারায়ণগঞ্জ
ঘটনার পরপরই নারায়ণগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির নেতাকর্মীরা। চাষাড়া এলাকায় মিছিল থেকে হাতেমকে “ফ্যাসিবাদের দোসর” আখ্যা দিয়ে তাকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
রহস্যজনক নীরবতা
অন্যদিকে এত বড় ঘটনার দুই দিন পার হলেও থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ না আসা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মান্নান বলেন,
“এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় অভিযোগ করেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।”
অথচ জোড়ালো অভিযোগ রয়েছে, এই হাতেম সেই আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামল থেকেই নিয়মিত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মোটা অংকের মাসোয়ারা প্রদান করেন যাচ্ছেন। একই সাথে হাতেম ছাড়াও ঝুট সন্ত্রাসীরা নিয়মিত মাসোয়ারা প্রদান করেই যাচ্ছে ওসি ও ওসির ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে। যার কারণে হাতেম ও তার ঝুট সন্ত্রাসী বাহিনী একজন সংসদ সদসম্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার সাহস করেছে।
প্রশ্নের মুখে শিল্পাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবের যে অস্বচ্ছ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
তাদের মতে, যদি সত্যিই কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন, অবরুদ্ধ করা কিংবা হামলার মতো কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু আইনের শাসনের জন্য নয়, শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও ভয়াবহ বার্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত না হলে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যেতে পারে।








Discussion about this post