আদালত প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জে অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা ও শীর্ষ পর্যায়ের একাংশ এবং প্রভাবশালী শিল্প মালিকদের গোপন আঁতাতে বছরের পর বছর ধরে শীতলক্ষ্যা নদীকে পরিকল্পিতভাবে বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবাদীদের।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়মিত ‘ম্যানেজ’ করেই চলছিল পরিবেশ ধ্বংসের এই ভয়াবহ লঙ্কাকাণ্ড।
ফলে নদী তীরের বহু শিল্পকারখানা কোনো ধরনের বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও কার্যত কোনো প্রতিকার ছিল না।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ক্রমশ কালো ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। প্রশাসনের নীরবতা ও দায়িত্বহীনতায় পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে স্থানীয়দের মধ্যেও।
এই অবস্থায় অবশেষে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষায় এক যুগান্তকারী আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ছাড়া পরিচালিত ২০টি শিল্প কারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসান-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ প্রদান করেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন Human Rights and Peace for Bangladesh (এইচআরপিবি)-এর এক সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এই কঠোর সিদ্ধান্ত জানান।
আদালতের নির্দেশনায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালক এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে অবিলম্বে এই আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সালের মধ্যে আদালতে ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বা পরিপালন প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, তালিকাভুক্ত ২০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ইটিপি ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব কারখানা সরাসরি বিষাক্ত বর্জ্য শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলায় নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—খালেক টেক্সটাইল, লীনা পেপার মিল, আরএসকে ডাইং, খান ব্রাদার্স টেক্সটাইল, এসআরএস নিড ডাইং, মেসার্স রুবেল ডাইং, বাংলাদেশ ডাইং অ্যান্ড প্রসেসিং, এশিয়ান ফেব্রিক, জিলানী ডাইং, গাজীপুর বোর্ড মিলস, নিউ আলম ডাইং, মায়ের দোয়া ডাইং, এমআর ডাইং, আব্দুর রব ডাইং, বিসমিল্লাহ নিড ডাইং, শিমুল ডাইং, রাজ্জাক ওয়াশিং এবং হাজী রাসুল ডাইং।
শুনানিতে এইচআরপিবির পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আদালতে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধান অনুযায়ী ইটিপি ছাড়া কোনো শিল্পকারখানা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু শিল্প মালিকরা দীর্ঘদিন আইনের তোয়াক্কা না করে সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলছেন, যা শীতলক্ষ্যা নদীর অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আবেদনটি আদালতে দাখিল করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সারোয়ার আহাদ চৌধুরী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মুনতাসির উদ্দিন আহাম্মেদ এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ শফিকুর রহমান।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও শিল্প মালিকদের স্বার্থের কাছে দীর্ঘদিন জিম্মি ছিল শীতলক্ষ্যা নদী।
তবে হাইকোর্টের এই কঠোর নির্দেশ বাস্তবায়ন হলে নদী রক্ষার লড়াইয়ে নতুন আশার সঞ্চার হবে। এখন দেখার বিষয়—দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো সত্যিই আইন প্রয়োগ করে নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নাকি আবারও কোনো অদৃশ্য প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার করে।









Discussion about this post