স্টাফ রিপোর্টার | নারায়ণগঞ্জ
ভাষাসৈনিক ও রত্নগর্ভা মা নাগিনা জোহার মৃত্যুবার্ষিকী একসময় নারায়ণগঞ্জে পারিবারিক ও রাজনৈতিকভাবে স্মরণীয় দিন হিসেবে পালিত হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা অনেকটাই নীরব হয়ে পড়েছে।
একসময় মিলাদ, কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হলেও গত তিন বছরে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
২০১৬ সালের ৭ মার্চ ইন্তেকাল করেন ভাষাসৈনিক নাগিনা জোহা। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন সচেতন নারী এবং নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত পরিবার ওসমান পরিবারের মাতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব।
তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত একেএম সামছুজ্জোহার সহধর্মিণী।
তার তিন ছেলে—প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম ওসমান এবং ছোট ছেলে শামীম ওসমান —নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
তাদের মধ্যে নাসিম ওসমান একাধিকবার সংসদ সদস্য ছিলেন এবং সেলিম ও শামীম ওসমানও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নাগিনা জোহা ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার কাশেমনগরের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবুল হাসনাত ছিলেন সমাজহিতৈষী ও ওই অঞ্চলের জমিদার।
শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল।
পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী এই পরিবারের সঙ্গে অবিভক্ত ভারতের মুসলিম লীগেরও সম্পর্ক ছিল।
নাগিনা জোহার বড় চাচা আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম অবিভক্ত ভারতের মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ও এমএলএ ছিলেন।
পরিবারটির সঙ্গে তৎকালীন উপমহাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদেরও সম্পর্ক ছিল।
১৯৫১ সালে একেএম সামসুজ্জোহার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। স্বামীর বাড়িতে আসার পরই তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্র ও জনতার আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন ও অংশগ্রহণ করেন বলে পারিবারিকভাবে উল্লেখ করা হয়।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেভাবে পরিবারের উদ্যোগে বা দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে নাগিনা জোহার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সে ধরনের কোনো আয়োজন প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।
নারায়ণগঞ্জের কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং স্থানীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণের প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাদের মতে, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক অবদান যাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাদের স্মরণ করা রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সামাজিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ হওয়া উচিত।
নাগিনা জোহা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যই নন, তিনি ভাষা আন্দোলনের সময়কার এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নারী হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তাই তার মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে আগের মতো সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজন না থাকায় অনেকেই বিষয়টিকে সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবেই দেখছেন।








Discussion about this post