নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নির্মাণাধীন ভবনের পাইলিং মেশিনের পাইপ পড়ে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
মাত্র তিন লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়ে একটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুকে মীমাংসা করার উদ্যোগ ঘিরে এলাকায় চরম ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে ফতুল্লার দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় নিহত হয় মুনতাসীর ইসলাম হামজা (৫)। সে বক্তাবলী ইউনিয়নের রাজনগর এলাকার মো. রুবেলের ছেলে। শিশুটির ডাকনাম ছিল ইয়াছিন।
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবার জানায়, নির্মাণাধীন ভবনে পাইলিংয়ের কাজ শেষ হলেও বিপজ্জনক লোহার পাইপ ও সরঞ্জাম সঠিকভাবে অপসারণ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী না দেওয়ায় ঘটনাটি ঘটে। অবহেলায় ফেলে রাখা একটি ভারী পাইপ শিশুটির ওপর পড়ে গেলে গুরুতর আহত হয় সে। পরে তাকে দ্রুত নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে ঘটনার পরপরই ভবনের মালিকপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসা করতে তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের পরিবারকে মাত্র তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহতের বাবা মো. রুবেল বলেন, ঘটনার সময় তিনি কাজের জন্য কুমিল্লায় ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পারেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“উজ্জ্বল ভাই ঠিকাদারের সাথে মসজিদে বসছিল। এলাকার আরও লোকজন ছিল। তারা আমারে তিন লাখ টাকা সাধছে। আমি টাকা দিয়া কী করমু ? আমার রাজপুত্রের মতো পোলাডাই যেইখানে নাই ।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, স্থানীয় একটি মসজিদে বসে ভবনের মালিকপক্ষ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতিতে আলোচনা হয়। সেখানে জেলা তাঁতীদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল মধ্যস্থতা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে নিহত শিশুর বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, টাকার বিনিময়ে সন্তানের মৃত্যুকে তিনি মেনে নিতে পারবেন না। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি বিচার দাবি করেছেন।
অন্যদিকে সন্তানের মরদেহ ময়নাতদন্তে দিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন তিনি। শোকাহত বাবা বলেন, “মরার পর আবার বাচ্চাটারে কাটাছেঁড়া করতে দিতে মন চাইতেছে না।”
এ বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল দাবি করেন, ভুক্তভোগী পরিবারের অনুরোধেই তিনি আলোচনায় বসেছিলেন।
তিনি বলেন, “পরিবারটা গরিব। বাচ্চা তো আর ফেরত দেওয়া যাবে না। ঠিকাদার কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলেছে। আমরা কয়েকজন মসজিদে বসে আলাপ করছিলাম।”
তবে একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও জানান।
এদিকে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মান্নান বলেন, নির্মাণাধীন ভবনে পাইলিংয়ের কাজ শেষ হলেও বিপজ্জনক পিলার ও পাইপগুলো সরানো হয়নি। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “শিশুটি ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি পাইপ পড়ে গুরুতর আহত হয়। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এখানে ভবন মালিক ও ঠিকাদারের স্পষ্ট অবহেলা ছিল।”
ওসি আরও বলেন, মীমাংসার চেষ্টা বা টাকা দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি পুলিশের জানা নেই। তবে নিহতের পরিবার অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি শিশুর জীবন কি এতটাই সস্তা যে মাত্র তিন লাখ টাকার বিনিময়ে দায় এড়ানো যায় ?
অবহেলায় একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এ ধরনের মৃত্যুর মিছিল থামবে কীভাবে—এ প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে।








Discussion about this post