স্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে নেওয়ার পথে প্রায় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির ঘটনায় সেই পুরানো শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী দল।
আলোচিত এই তেল চুরির ঘটনায় স্থানীয়ভাবে কুখ্যাত ‘ব্রাজিল বাড়ির টুটুল সিন্ডিকেট’–এর নাম আবারও সামনে এসেছে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ঘটনাটি তদন্তে নেমেছে পদ্মা অয়েল পিএলসির একটি বিশেষ টিম। দুদিন ধরে চলা তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, তেল পরিবহনের তথ্য ও ডিপোর মজুদ পরিমাপ মিলিয়ে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে তেল চুরির প্রাথমিক প্রমাণ সামনে আসতেই কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) মো. সাইদুল হককে হঠাৎ বদলি করা হয়েছে।
রোববার (১৫ মার্চ) পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) মীর মো. ফখর উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়। একই আদেশে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে দৌলতপুর ডিপোর ইনচার্জ মো. রিদওয়ানুর রহমানকে।
সিসিটিভিতে মিলেনি তেলবাহী গাড়ির প্রবেশ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোদনাইল থেকে চারটি গাড়িতে করে যে জেট ফুয়েল কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছানোর কথা ছিল, ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজে সেই গাড়িগুলোর প্রবেশের কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ডিপোতে সংরক্ষিত জ্বালানির পরিমাণ পরিমাপ করেও ঘাটতির প্রমাণ মিলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তদন্তকারীরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে পথে কোথাও জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার পেছনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি তেলচোর চক্র কাজ করছে।
টুটুল সিন্ডিকেটের ছায়া
ঘটনার আগে গত ১৩ মার্চ দিবাগত রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে “অস্থিরতার মধ্যে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরি, নেপথ্যে পুরনো সিন্ডিকেট” এবং “ব্রাজিল বাড়ির টুটুল সিন্ডিকেটের কারসাজি” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরি, জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি শক্তিশালী চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে এই টুটুল সিন্ডিকেট। বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক তদারকি দুর্বল হলে তারা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দুদিন ধরে তদন্ত
ঘটনা খতিয়ে দেখতে পদ্মা অয়েলের তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছায়। তদন্ত দলে রয়েছেন—
# উপ-মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) ও হেড অব ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স মো. শফিউল আজম এসিএ
# ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহাম্মদ
# কর্মকর্তা (ইঞ্জি.) কে এম আবদুর রহিম
প্রথম দিন তারা ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ ও তেল পরিবহনের নথি যাচাই করেন এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ক্যামেরা ফুটেজও পরীক্ষা করেন। পরে রোববার কাউকে না জানিয়ে আকস্মিকভাবে আবার ডিপোতে গিয়ে তদন্ত চালিয়ে তেলের ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত হন।
পুরনো অভিযোগে ঘেরা সাইদুল হক
তদন্তের মুখে বদলি হওয়া কর্মকর্তা মো. সাইদুল হকের বিরুদ্ধে তেল চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়।
জানা গেছে, গত বছরের ২০ জানুয়ারি পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ তাকে সতর্ক করে চিঠি দেয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এরপরও সিন্ডিকেটের কার্যক্রম থামেনি।
এছাড়া কুর্মিটোলা ডিপো থেকে ধারাবাহিক তেল চুরির অভিযোগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করে। তদন্তের অংশ হিসেবে গত ৮ মার্চ ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
দুদকের নজরেও
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাইদুল হকের বিরুদ্ধে সনদ ও স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
এমন তদন্তের পরও ব্যাপক সমালোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে দুদকের অসাধু একটি চক্র এই অপরাধীদের নানাভাবে রক্ষা করতে তৎপর রয়েছে। যেমন বিগত সময়ে ব্রাজিল বাড়ির সেই টুটুল কে এক কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে দূর্ণীতির অভিযোগ থেকে রক্ষা করেছে।
২০১৯ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় তিনি জাল বেতন সনদ দাখিল করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে সাইদুল হকের বিরুদ্ধে।
ওই সময় দুদক ম্যানেজ হওয়ার সেই অপকর্ম করে রক্ষা পায় সাইদুল হক।
এমতাবস্থায় এসব অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ২০২০ সালে তাকে উপ-ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকার বনানীতে তার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। এছাড়া তিনি একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়িও ব্যবহার করেন।
তদন্ত শেষে প্রতিবেদন
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন,“দুদিন ধরে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তদন্ত শেষ হলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, জেট ফুয়েল চুরির এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত তৎপরতার ফল। তদন্তে যদি সত্যিই টুটুল সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তাহলে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের দুর্নীতির জাল উন্মোচিত হতে পারে।








Discussion about this post