নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার সিটি কলোনি, যা স্থানীয়ভাবে ‘মেথরপট্টি’ নামে পরিচিত—দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ মাদক ও মদের কারবারের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে আলোচিত।
এই চক্রের কেন্দ্রে রয়েছে গিয়াস উদ্দিন রুবেলের মালিকানাধীন ‘সেন এন্ড কোং’, যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চোরাই ও ভেজাল মদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
আরো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এই রুবেল প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার চোলাই মদ তৈরি করে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় চোরাইপথে পাচার করে। মূলত নৌ পথে চলে এই চোরাই মদের চোরাকারবারী।
রোজার ঈদকে সামনে রেখে শুক্রবার ২০ মার্চ দিবাগত রাতে এ এলাকায় অভিযান চালায় সদর মডেল থানা পুলিশ। অভিযানে ১৯৬ লিটার সেন কোম্পানির অবৈধ বোতলজাত মদসহ তিনজনকে আটক করা হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি—এই অভিযান সামগ্রিক চিত্রের তুলনায় খুবই সীমিত।
উৎসবকেন্দ্রিক মদের বাণিজ্য
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, থার্টি ফার্স্ট নাইট, ঈদ কিংবা বিভিন্ন পূজা-পার্বণকে ঘিরে টানবাজারে অবৈধ মদের রমরমা বাণিজ্য গড়ে ওঠে। বিশেষ করে রুবেলের ‘সেন এন্ড কোং’ এসব সময়ে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ মজুদ ও সরবরাহ করে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের বৈধ মদের দোকানগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মদ সংগ্রহ করে তা মেথরপট্টির চিহ্নিত কারবারিদের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—টানবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ও সদর থানার অদূরেই প্রকাশ্যে এই ব্যবসা চললেও দীর্ঘদিন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছিল চক্রটি।
ফলে এলাকাটি কার্যত একটি ‘ওপেন ড্রাগ জোনে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে আইনের উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ।
রুবেলের বিরুদ্ধে ‘গডফাদার’ অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গিয়াস উদ্দিন রুবেল শুধু একজন ব্যবসায়ী নন—তিনি একটি সংগঠিত মাদক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তর, এমনকি প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণেই তাকে অনেকেই ‘চোরাই মদের গডফাদার’ হিসেবে আখ্যা দেন, যার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পান অনেকেই।
ডিএনসির অভিযান ও বাস্তবতা
এর আগে ৩১ ডিসেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) টানবাজারে অভিযান চালিয়ে ৫০ লিটারের বেশি মদ উদ্ধার এবং গোবিন্দ দাস (৩২) নামে এক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানের সময় আরও কয়েকজন কুখ্যাত ব্যবসায়ী পালিয়ে যায় বলেও জানা যায়।
ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, উৎসবকে কেন্দ্র করে মাদক সরবরাহ বাড়ার আশঙ্কায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—বছরের পর বছর প্রকাশ্যে চলা এমন বিশাল নেটওয়ার্কে শুধু খুচরা কারবারিদের গ্রেপ্তার কতটা কার্যকর ?
মূল প্রশ্ন : গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন ?
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সমস্যার মূল শিকড়ে আঘাত না করলে এই ধরনের অভিযান টেকসই সমাধান আনতে পারবে না। তারা মনে করেন, রুবেলসহ মূল হোতা, তাদের পৃষ্ঠপোষক এবং দায়িত্বে থেকেও নীরব থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় না আনলে টানবাজারে অবৈধ মদের কারবার বন্ধ হবে না।
উপসংহার
টানবাজারে সাম্প্রতিক অভিযান কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বাস্তবতা বলছে—অবৈধ মদের এই নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়।
একজন বা দু’জন গ্রেপ্তার হলেও মূল চক্র অক্ষত থাকলে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হবে না।
আইনের কার্যকর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে টানবাজারে ‘সেন এন্ড কোং’-এর মতো চক্রগুলো নতুন নামে, নতুনভাবে আবারও ফিরে আসবে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।








Discussion about this post