আগুন লাগার দেড় ঘণ্টার মধ্যে বীমা কম্পানিকে ঘটনাটি ফোনে জানানো হয়। কিন্তু ৫২ শ্রমিকের প্রাণহানির বিষয়টি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় আগুনের ঘটনায় মালিকপক্ষের এমন পদক্ষেপে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি শ্রমিকের জীবনের চেয়ে সম্পদের মূল্যই বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসেম ফুডস কমপ্লেক্সের প্রায় সব কারখানা ভবন ও অন্যান্য সম্পদ বীমার আওতায় রয়েছে। কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী, কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বীমা করা ছিল না। এতে করে অগ্নিকাণ্ডে হতাহত শ্রমিকদের পরিবারের বীমা কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর থাকল না।
শ্রম আইন অনুযায়ী, স্থায়ী শ্রমিকের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত হলে ক্ষতিপূরণ পাবে আড়াই লাখ টাকা। পঙ্গু হয়ে গেলে পাবে আড়াই লাখ টাকা। আর স্বাভাবিক মৃত্যু হলে একজন শ্রমিককে দুই লাখ টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের ভ্যাট ম্যানেজার মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘কম্পানির কারখানা ভবন ও অন্যান্য সম্পদ বীমার আওতায় ছিল। শ্রমিকদের নিরাপত্তায় গ্রুপ বীমা ছিল না।’
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, হাসেম ফুডস কমপ্লেক্সে ১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ভবন বীমার আওতায় ছিল। এই বীমার মধ্যে আছে অগ্নিবীমা ও শিল্প ঝুঁকি বীমা (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অল রিস্ক)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারটি সাধারণ বীমা কম্পানিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অল রিস্ক ও অগ্নিবীমার পলিসি রয়েছে হাসেমের। কম্পানিগুলো হলো দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল জেনারেল ইনস্যুরেন্স, রিপাবলিক ইনস্যুরেন্স ও সেন্ট্রাল ইনস্যুরেন্স কম্পানি লিমিটেড।
সাধারণ বীমা করপোরেশন সূত্র জানায়, হাসেমের কারখানা ভবন ও সম্পদের ওপর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আইএআর ও অগ্নিবীমা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের গ্রুপ বীমার আওতায় আনেনি কোম্পানি।
গত ৮ জুলাই বিকেলে হাসেম ফুডের কারখানায় আগুন লাগে। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগে আগুন পুরোপুরি নেভাতে। আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে কারখানা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন শ্রমিক নিহত হয়। পরে চারতলায় এক জায়গা থেকে ৪৯ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত হয় অন্তত ৩০ জন। আর নিখোঁজ থাকা ৪৭ জনের একটি তালিকা তাৎক্ষণিকভাবে করেছিল স্থায়ী প্রশাসন।
ছয়তলা ওই ভবনের নিচতলা ও ছয়তলা বাদে বাকি চারটি ফ্লোরে চকোলেট, বিস্কুট, কোমল পানীয়, লাচ্ছা সেমাইসহ বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যপণ্য তৈরি হতো।
কারখানার মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মৃত্যুঞ্জয় জানান, পুড়ে যাওয়া ওই ভবনে বিভিন্ন পালায় ২২০-২৩০ জন শ্রমিক কাজ করত। তারা সবাই স্থায়ী শ্রমিক। অন্যান্য ভবনে কর্মরত শ্রমিকসহ ওই কমপ্লেক্সে শ্রমিকের সংখ্যা অন্তত দুই হাজার। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ওই কমপ্লেক্সে পাঁচ-ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করে।
কম্পানির হিসাবরক্ষক ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, কারখানায় স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৪০০। আর অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা দুই হাজার ২০০। শ্রমিকদের গ্রুপ বীমা করা নেই বলে জানান তিনি। কম্পানির পক্ষ থেকে তাঁর নিজের বীমা করা আছে কি না জানতে চাইলে ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, ‘না, আমার নামে কোনো রকমের বীমা নেই।’
আগুনে নিহত শ্রমিক মিতু আক্তারের বাবা বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়ের কোনো বীমা ছিল কি না আমি জানি না। কারখানার অন্য শ্রমিকদের বীমা করা আছে কি না সেটাও জানি না।’
শ্রম আইন ২০০৬-এ বলা হয়েছে, শ্রমিকদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত ১০০ জন স্থায়ী শ্রমিক কর্মরত তাদের জন্য বীমা আইন অনুযায়ী গ্রুপ বীমা চালু করতে হবে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্তরা এই বীমার আওতায় ক্ষতিপূরণ পাবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত দল জানায়, কারখানায় অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল না। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ রাখা ছিল। এতে শ্রমিকদের জীবন অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যেই ছিল।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্র জানায়, হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের মালিক মুনাফা বেশি করতে চেয়েছেন। কারণ শ্রমিকদের গ্রুপ বীমার আওতায় আনলে মালিককেই প্রিমিয়াম দিতে হয়।
বাংলাদেশ লিগ্যালএইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবী ও উপদেষ্টা তাজুল ইসলাম কে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পখাত হলে এবং সরকার কর্তৃক তহবিল গঠিত হলে উক্ত প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বীমা করা থেকে অব্যাহতি পায়। কিন্তু হাসেম ফুডস শতভাগ রপ্তানি নির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে এখানে গ্রুপ বীমা করা বাধ্যতামূলক। শ্রম আইনের ৩০৭ ধারা অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বীমা না করার জন্য হাসেম ফুডসকে মাত্র ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। আবার বীমা না করার জন্য কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে ১৩২ ও ১৩৩ ধারা অনুযায়ী শ্রম আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে।’
ব্যারিস্টার কে এম তানজিব-উল আলম বলেন, শ্রম আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায় শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের পক্ষে কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসেম ফুডস কারখানায় আগুন লাগে বিকেল সাড়ে ৫টায়। এর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই বীমা কম্পানিগুলোকে ফোনে জানায় মালিকপক্ষ। ১১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ই-মেইলে দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্স ও রিপাবলিক ইনস্যুরেন্সকে জানানো হয়। কম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, চিঠি দেওয়া মানে ক্ষতিপূরণ চাওয়া।
অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির ক্ষেত্রে দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঘটনা কলকারখানা পরিদর্শককে নোটিসকে করে জানানোর বিধান আছে। কিন্তু হাসেম ফুডস কারখানা তা করেনি। এ কারণে কারখানা মালিক আবুল হাসেম ও উপমহাব্যবস্থাপক মামনুর রশিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে অধিদপ্তর।
সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বা অগ্নিবীমা সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য করা যায়। প্রিমিয়াম একবারেই দিতে হয়। এই প্রিমিয়াম হয় কম্পানির সক্ষমতার ওপর। প্রিমিয়ামের একটি অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনে পুনঃ বীমা হিসেবে জমা দিতে হয়। সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের দায়ও করপোরেশন বহন করে।
কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট চারটি বীমা কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা জানান, হাসেম ফুডস কারখানার ভবন ও সম্পদের ওপর প্রায় ৪৯৯ কোটি টাকার বীমা করা আছে। এর মধ্যে রিপাবলিক ইনস্যুরেন্স কম্পানিতে ১৪৩ কোটি টাকার অগ্নিবীমা রয়েছে। দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্সে ৩০৩ কোটি টাকার একটি আইআরএ বীমা রয়েছে। এর মধ্যে দেশ ইনস্যুরেন্স ৫৫ শতাংশ ও কন্টিনেন্টাল ইনস্যুরেন্স ৪৫ শতাংশ বীমা দায় গ্রহণ করেছে। দেশ ইনস্যুরেন্সে ৪৬ কোটি টাকার আরেকটি আইআরএ বীমা রয়েছে। এই বীমার দায় দেশ ইনস্যুরেন্সের ৬০ শতাংশ ও সেন্ট্রাল ইনস্যুরেন্সের ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া দেশ ইনস্যুরেন্সে সাত কোটি টাকার আরো একটি বীমা রয়েছে।
সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘হাসেম ফুডস সম্পদের ওপর ইনস্যুরেন্স করলেও শ্রমিকদের জন্য কোনো রকমের গ্রুপ ইনস্যুরেন্স করেনি বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ তিনি বলেছেন, যেদিন আগুন লেগেছিল সেদিন কী পরিমাণ সম্পদ ছিল সেই হিসাব করা হবে। এরপর বীমা কম্পানিগুলো থেকে হাসেম ফুডস কত টাকা পাবে সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে। সাধারণ বীমা করপোরেশন এরই মধ্যে কম্পানিগুলোকে ক্ষতি নিরূপণের জন্য জরিপ করতে তাগিদ দিয়েছে।
তবে গতকাল রবিবার পর্যন্ত চারটি বীমা কম্পানি সাধারণ বীমা করপোরেশনকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি ও মোট কত টাকার বীমা করা ছিল সে তথ্য দেয়নি।
রিপাবলিক ইনস্যুরেন্স কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে এই কম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হাসেম ফুডস ১৪১ কোটি টাকার ফায়ার ইনস্যুরেন্স করেছে ।
কন্টিনেন্টাল ইনস্যুরেন্স কম্পানির এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, কত টাকা প্রিমিয়াম দিয়েছে তাঁর তা জানা নেই।
হাসেম ফুডস সজিব গ্রুপ লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অগ্নিকাণ্ড তদন্তে হাসেম ফুডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একটি তদন্ত কমিটি করেছেন। শ্রমিকদের বীমা বা তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে রাজধানী ঢাকার ইন্দিরা রোডে গ্রুপের কার্যালয়ে গেলেও সেখানে কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যর্থনা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তদন্ত কমিটির সদস্যরা পরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু গতকাল দুই দিন পার হয়ে গেলেও তদন্ত কমিটির কেউ যোগাযোগ করেননি। কমিটির প্রধান কম্পানির কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল্লাহকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
(সূত্র : কালের কন্ঠ)









Discussion about this post