গুরুতর অসুস্থ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে খোদ তার দলের মধ্যেই শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। সৃষ্টি হয়েছে নানা ক্ষোভের। ২০ ডিসেম্বর তিনি মিশন পাড়ার একটি সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে দাবি করেছেন, ‘মমিনউল্লাহ ডেভিড তার কথা শুনলে মারা যেত না।’ তার বক্তব্য ছিল, খোদ বিএনপি সরকারই ডেভিডকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো !
তৈমূর আলম খন্দকার তার বক্তব্যে বলেন, ডেভিড আমার কথা শুনলে মরতো না। তিনি দাবি করেন, সেদিন হারিস চৌধুরী তাকে ফোনে জানিয়েছিলেন, “নারায়ণগঞ্জের তিনটি নাম রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন ম্যাডামতো সকলের মা। আমি আপনারে এই মেসেজটা দিলাম। আপনি এই তিনজনরে পৌঁছান।’ তালিকা হয়েছে।’ আমি ওর বাইত গিয়া কইয়াছি। বলছি, এই এই সিদ্ধান্ত।” তিনি বলেন, “ডেভিড আমারে জিগাইলো ‘আমি এখন যামু ক্যামনে!’ আমি কই তুই প্লেন দিয়া যাবি, তরে এয়াপোর্ট লইয়া যামু। প্লেন উইড়া যাইবো, হেরপর আমি আসমু।”
এদিকে বিএনপি প্রায় সময় বর্তমান সরকারের দিকে অভিযোগ তুলে বলেছে, এই সরকার রাষ্ট্রীয় হত্যায় মেতেছে। তারা বহু খুন গুমের জন্য সরকারকেই দায়ী করেন। তারা আরও বলেন, র্যাবকে রাষ্ট্রীয় হত্যায় ব্যবহার করছে সরকার। তবে, তৈমূর আলম খন্দকারের ওই বক্তব্যের পর অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, রাষ্ট্রীয় হত্যা বিগত জোট সরকারই শুরু করেছিলো। যা তিনি নিজেই জানতেন।
তবে, বিএনপি দলীয় অনেক নেতাকর্মীই প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে থেকে এভাবে তিনি বলতে পারেন কিনা! সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অ্যাড. তৈমূর আলম খন্দকারের অমন বক্তব্যকে বেশ ভালোভাবেই লুফে নিয়েছে। তারা বলছেন, বোয়ালের আন্ডা বোয়ালই ভাঙ্গে। তবে, রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, দলের বড় একটি পদ ব্যবহার করছেন তৈমূর। তিনি যা বলেছেন, তা তার দলের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। সে হিসেবে বিএনপিতে তার পদ থাকার কথা না।
এদিকে তৈমূর আলম খন্দকারের বক্তব্যের পর খোদ মমিনউল্লাহ ডেভিডের অনুসারিদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। তারা বলছেন, যে দলের জন্য নিবেদিত ছিলেন ডেভিড, সেই দলই তাকে হত্যা করেছে!
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “মমিনউল্লাহ ডেভিড আমাদের দলের একজন নেবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। তার মৃত্যু দুঃখজনক এবং আমাদের দলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এই বিষয়টা খুব স্পর্শকাতর। ফলে এ নিয়ে দলের কোনো নেতার বক্তব্য দায়িত্ব নিয়েই বলা উচিৎ। এই বক্তব্য যদি কোনো প্রশ্নের উদ্রেক করে, তাহলে আমি মনে করি সে ধরণের বক্তব্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির দেওয়া উচিৎ না যা দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।”
এদিকে একই বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিলো জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ হাসান রোজেলের কাছে। তিনি বক্তব্যটি শুনেন জানিয়ে বলেছেন, যে বক্তব্য আমি শুনিনি তা নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে পারবো না।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাসুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, “দলের দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিৎ নয় যা দলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি (তৈমূর) কোন অবস্থান থেকে এমন কথা বলেছেন, সেটি আমি নিশ্চিত নয়। তবে, দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিৎ বলে আমি মনে করি।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রুহুল আমিন সিকদার বলেন, “বর্তমানে দলের দুঃসময়। দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন সিনিয়র লিডারের থেকে এমন কোনো বক্তব্য আসা উচিৎ না, যা দল প্রশ্নের সম্মুখিন হয় এবং সমালোচনার পাত্র হয়।”
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে ঢাকার মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ডেভিড গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন তথা র্যাবের দাবি ছিল, তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের এক পর্যায়ে ক্রসফায়ারে পড়ে ডেভিডের মৃত্যু ঘটে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মালিবাগ এলাকায় ডেভিড একটি বিলাসবহুল গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার সময়ে ওই ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে ডেভিডের সঙ্গে তার গাড়িতে এক সুন্দরী নারী থাকলেও আদৌ তার পরিচয় মেলেনি। এখানো অনেকে খুঁজে বেড়ান কিংবা কৌতূহলভরে খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করেন সেই নারীকে।
বিএনপি সরকারের সময়ে ক্রসফায়ারে ডেভিডের মৃত্যুর ঘটনাটি অনেক আলোচিত হয়। অনেকে এর সমালোচনাও করেন। কারণ, এ ডেভিডকে দিয়েই একসময়ে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করতো বিএনপি। শহরে এমন খবর চাউর ছিল অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সঙ্গে সংঘর্ষের বেশিরভাগ সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড। তিনি ছিলেন অস্ত্র চালনায় দারুণ পারদর্শী। একজন দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী হিসেবে তার ‘খ্যাতি’ ছিল সর্বত্র।
নগরীতে তৈমূর আলম খন্দকারের এমন মন্তব্য প্রচারের পর বিএনপির অনেকেই বলছেন, বিএনপির বিরুদ্ধে বোমা ফাটালেন অ্যাডভোকেট তৈমূর । যার হিসেব তিনিই দিবেন দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে ।









Discussion about this post