নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের ভূমিকা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক সাংসদের ইশারায় তিনি আইভীর বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে নেমেছেন তা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত এ নারায়ণগঞ্জে ।
প্রকাশ্যে সেই সাংসদ ফেরদাউসকে নিজের ‘ছোট ভাই’ বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবার তিনি নেমেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে। প্রার্থীর পক্ষে নামলেও তার মূল বিরোধীতা আসলে আইভীর বিরুদ্ধে।
জনশ্রুতি রয়েছে, সাংসদ বড় ভাইয়ের নির্দেশেই তৈমুরের পক্ষে নেমেছেন ফেরদাউসুর রহমান। যদিও মাত্র কয়েকদিন পূর্বেও তিনি কাজ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত এক ইউপি চেয়ারম্যানের পক্ষে। তার এই দ্বৈত চরিত্রের কারণে অনেকেই বলছেন, ফেরদাউসুর রহমান হেফাজতে ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিলে কাজ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফতুল্লা ইউনিয়র পরিষদ নির্বাচনে হেফাজতের ভোট নৌকার পক্ষে টানতে নানাবাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন । এছাড়াও ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী জাকির হোসেনের পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট চেয়ে বেরিয়েছেন মাওলানা ফেরদাউসুর। নৌকার ফুল হাতেও তাকে ফটোসেশনে দেখা যায়। নৌকার প্রার্থীকে নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতেও যান তিনি।
কয়েকদিন আগেও ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী লুৎফর রহমান স্বপনের পক্ষে নৌকার ভোট চেয়েছেন। সেই ফেরদাউসই আবার আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী নানা বক্তব্য দিয়ে বেড়ান। এখন আবার নেমেছেন নৌকার প্রার্থী আইভীর বিরুদ্ধে। ধর্মীয় সংগঠনের এই নেতার ভূমিকাকে ভালো চোখে দেখছেন না নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করছেন তিনি। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা এবং তাদের ধর্মীয় উদ্দেশ্যে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, ফেরদাউস হেফাজতে ইসলাম ব্যবহার করে ইসলামকে হেফাজতে নয় নিজের স্বার্থ হেফাজতে কাজ করছেন। যদিও ফেরদাউস শুধু হেফাজতে ইসলাম নয় ওলামা পরিষদ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সাথেও জড়িত।
এদিকে এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন জেলা ওলামা পরিষদের সহ সভাপতি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত হাতপাখার প্রার্থী মুফতি মাসুম বিল্লাহ। একসাথে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করলেও মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম সমর্থন দিচ্ছে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে। তাদের এই সমর্থনের পেছনে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এক নেতার ভূমিকা দেখছেন সতেচন মহল। তাদের দাবি, নিজ দলে দীর্ঘদিন ধরে আইভীর বিরুদ্ধে নানান কল্পিত প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন এই নেতা। নির্বাচনে যেন আইভী আওয়ামী লীগের সমর্থন না পান সেই চেষ্টাও চালিয়েছেন। কিন্তু আইভীর নৌকা ঠেকাতে না পেরে আইভীর বিরুদ্ধে এখন প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে তিনি মাঠে নামিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ অন্য দলের ও বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের। তারই অংশ হিসেবে ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রার্থীর সমর্থনে কাজ না করে নেমেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে।
জানা যায়, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাদ জুমা চাষাঢ়ায় বাগে জান্নাত জামে মসজিদের সামনে নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে আইভী বিরোধী এক সমাবেশে নেতৃত্ব দেন মাওলানা ফেরদাউস। সেই সমাবেশে আইভীর ‘কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও’ স্লোগানও দেয়া হয়েছিল। তারা আইভীর ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করে নির্বাচনী প্রচারণার একটি ছবিকে মন্দিরে দেবতার সামনে মাথায় সিঁদুর দিয়ে প্রণাম করারও অপব্যাখ্যা দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আইভী বিরোধী অংশের সুরে। সেই সমাবেশে আইভীকে শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় বক্তারা।
সেই সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান আইভীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমাদেরকে নিয়ে বসতে ওনার ভালো লাগে না। কেন আমরা যদি সামনে যাই। বড় হুজুররা যদি সামনে যায় ওনার ঘোমটা দেয়া লাগবো। ওনি ঘোমটা দিতে চায় না। উনি ঘোমটা খুলে বেটা সাজতে চায়। নামাজও মনে হয় পরেন না। দুই হাতে যে কতটি আংটি আছে। কোরবানিও করে না। ধর্মটা ভালো না লাগলে যান গা। কিন্তু ধর্ম নিয়া খেলতে দিব না। ধর্ম নিয়া আমরা খেলি না। মন্দিরে ধর্ম ব্যবসা আপনি করেন। মুসলমানের সাথে ধর্ম ব্যবসা আপনি করেন। খোদার কসম আগামী সিটি নির্বাচনে আপনাকে জনগণ উচিত জবাব দিয়ে দিবে।’
মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের এমন দ্বৈত চরিত্রের কারণে হেফাজতে ইসলাম ও ওলামা পরিষদের নেতারাও বিরক্ত। তারা অনেকেই উপেক্ষা করে চলেন ফেরদাউসকে। সিটি নির্বাচনে ওলামা পরিষদের নেতা মুফতি মাসুম বিল্লাহ মেয়র পদপ্রার্থী হলেও তাকে সমর্থন দিচ্ছেন না ফেরদাউস। যদিও তিনি জেলা ওলামা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক পদে রয়েছেন। তিনি তার অনুসারী নেতা-কর্মীদের নিয়ে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্তী তৈমুর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তবে তার এই অবস্থানকে ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছেন মেয়র প্রার্থী মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, ফেরদাউসুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে তৈমুর আলমকে সমর্থন দিয়েছেন। হেফাজতে ইসলাম কিংবা ওলামা পরিষদ সাংগঠনিকভাবে তৈমুর আলমকে সমর্থন দেননি। উল্টো ওলামা পরিষদের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতারা মাসুম বিল্লাহকে সমর্থন দিয়েছেন।
এদিকে ফেরদাউসুর রহমানের দ্বৈত চরিত্রের সমালোচনা করে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘তার তো কোনো আদর্শ নেই। এক সময় এক জনের সাথে ওঠে, আরেকজনের সাথে বসে। উনি ব্যক্তিগতভাবে কাকে সমর্থন দিচ্ছেন সেটা ওলামা পরিষদের অবস্থান হতে পারে না।’









Discussion about this post