নারায়ণগঞ্জ শহরের হকার মানেই ওসমান পরিবারের লাঠিয়াল বাহিনী । এর প্রমাণ দিয়েছে হকার নেতা নামধারী চাঁদাবাজরা। শহরের পুলিশ প্রহরায় চাঁদাবাজি ছাড়াও সকল ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডর হোতা চাঁদাবাজ আসাদ, রহিম মুন্সীসহ অসংখ্য অপরাধীরা দীর্ঘদিন নগরবাসীকে জিম্মি করে অপরাধের রাম রাজত্ব চালিয়ে আসছিলো।
ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা কেউ হকার না হলেও প্রায় সকলেই ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে প্রমাণ করেছে বারবার । যারা পসরা নিয়ে ফুটপাত দখল করে বেচাকনা করে তারা প্রায় সকলেই ৫শ টাকা রোজের কর্মচারী।দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দোকানী করে লাভ লোকসানের সকল হিসাবের নেপথ্যে রয়েছে অজানা মহাজন। একেকটি ভ্যানগাড়ী কিংবা ফুটপাত দোকানীর মহাজন যেন একেকজন রাঘববোয়াল। নূর মসজিদের সামনের কয়েকটি ফুটপাতের দখলদার একজন মহাজন কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে ফুটপাতের জুতার দোকানে ।
আর এই ফুটপাত দখল করতে নিম্নে ৩০ হাজার আর ঊর্ধ্বে এক লাখ টাকা আগাম দিয়ে এই ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে দোকানীরা। একেকটি ফুটপাতের পসরা সাজাতে এবং বেচাকেনা করতে ২ থেকে তিন জন কর্মচারীও প্রতিদিন ৫শ টাকা রোজে কাজ করে যাচ্ছে। ফুটপাতের এই দোকানীরা একদিকে কর্মচারীদের দিয়ে সকল ধরণের ঝক্কি ঝামেলা মোকাবেলা করে আবার মারপিটেও ওস্তাদ এই ফুটপাতের হকার নামধারী কর্মচারীরা।
সেই কর্মচারীরা বিগত সময়ের মতো ওসমান পরিবারের ডাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার উপর হামলা করে পালিয়ে যায় । কিছুদিন যেতে না যেতে সেই হামলাকারী হকাররা ফিরে এসে আবারো নিয়ন্ত্রণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর থেকে হকার্সলীগ ও হকার নেতারা আত্মগোপনে চলে যায়। ছাত্র-জনতা হতাহত মামলায় তাদের নাম না থাকায় নারায়ণগঞ্জ ফিরেছে ওই সব নেতারা। এখন বিএনপি একাংশ ও এলাকার যুবকদের যোগসাজতে চাষাঢ়া থেকে গ্রীনলেজ ব্যাংক ও পুরাতন কোট পর্যন্ত হকারদের নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে একজন ফুটপাতের কর্মচারী বলেন, ‘ভাই আমি ৫০০ টাকার কর্মচারী। আমাকে আমার মহাজন যা বলে আমি তা ই করি। তবে কয়েকদিন চাঁন্দা বন্দ থাকলেও ৪/৫ দিন যাবত পুরান কোর্ট এলাকায় ওই সোহেল নিজেই চান্দা দিতে কইতেছে। কেউ কেউ চান্দা দেয় আবার কেউ দেয় না। হকার নেতা আসাদ, রহিম মুন্সী সহ হজ্ঞলে নিল্লা নাকি সিদ্ধান্ত নিছে ওই পুরাইন্না হিসেবেই চলবো ফুটপাত। নাইলে অসুবিধা হইবো কইয়া গেছে সোহেল। ‘
শুধু ছাত্র-জনতাই নয় সাবেক সিটি মেয়র ডা. আইভী ও সুশীলদের উপর হামলা চালিয়ে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার্স সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও শ্রমিকলীগ হকার নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ, নারায়ণগঞ্জ মহানগর হকার্স লীগের সভাপতি আঃ রহিম মুন্সী, সাধারণ সম্পাদক মো. সোহেল, মো. রানা, মো. শাহিন । এদের বিরুদ্ধে মেয়র থাকতে মামলা হলেও প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানের কারিশমায় গ্রেপ্তার হয়নি বরং হকার নিয়ন্ত্রণে আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। গত কয়েকদিন ধরে হকারলীগ নেতাদের ফুটপাতে নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যা পর থেকে দেখা গেছে।
৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের সকালে চাষাঢ়া ছাত্র-জনতা এক দফা বাস্তবায়নের অবস্থান কর্মসূচীতে আচমকা হামলা করে যুবলীগ ছাত্রলীগ ও হকারলীগ নেতারা। ওই সময় ছাত্র-জনতাকে ধাওয়া দেয়া বেশিভাগ ছিলো শহরের হকারলীগের নেতারা। টানা কয়েক ঘন্টা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ওই দুইজ মারা যাবার গুঞ্জন ছিলো। অন্যদিকে একাধিক ছাত্র-জনতা আহত হলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাতে রূপ নেয়।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে শহরের নাগরিক সমস্যা সমাধানে পরস্পরকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। বৈঠকে শহরের যানজট নিরসনে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ প্রাধান্য পায়।
এর প্রতিবাদে ১০ ফেব্রুয়ারি নগরীর চাষাড়ায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে পাঁচ শতাধিক হকার। এতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এসময় হকার সংগঠনের নেতারা ১২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করার ঘোষণাও দেন। মেয়র ও এমপিদের হুশিয়ারি দিতে বলেন, আমাদের অধিকার আমরাই আদায় করব। হয় মরব, না নয় অধিকার আদায় করব। অধিকার আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব। তার আগে রাজপথ ছাড়ব না। হকারদের যুক্তিক আন্দোলনে আমরা তাদের পাশে আছি। পুনর্বাসন ছাড়া হকারদের কোনোভাবে উচ্ছেদ করা যাবে না।
আইভীকে উদ্দেশ্য করে হকার নেতারা বলেন, আপনি কথায় কথায় বলেন হকারদের পুনর্বাসনের জন্য হকার্স মার্কেট দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে হকার রয়েছে পাঁচ হাজার। আর হকার্স মার্কেটে দোকান দিয়েছেন ছয়শ। আর দুই হাত বাই দুই হাত জায়গার দোকান দিয়ে তো দোকানদারি চলে না। আমরা আপনাকে নৌকায় ভোট দিয়ে মেয়র বানাইছি। কথায় কথায় হকার উচ্ছেদ করবেন না। সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানকেও উদ্দেশ্য করে হকার নেতারা বলেন, আপনারা আমাদের অভিভাবক, আপনারা গরিবের বন্ধু। আমরাও কিন্তু আপনাদের ভোট দিয়ে এমপি বানাইছি। আপনারা এ অসহায় গরিব হকারদের জন্য কিছু করেন। আপনারা চাইলে সব কিছুই হয়। দয়া করে আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।
এর এক মাস পর হকারদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১১ মার্চ তৎকালীন এমপি সেলিম ওসমান হকার সমিতির নেতাদের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করিয়ে তাঁদের বসার ব্যবস্থা করেন। অঙ্গীকারনামায় শর্ত থাকে, হকাররা বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসতে পারবেন না। তাঁরা কেবল সলিমুল্লাহ সড়কের ফুটপাতে বেলা ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। তবে রমজান মাসে শুক্র ও শনিবার সলিমুল্লাহ সড়কের একটি পাশ (সড়ক বিভাজকের দক্ষিণ পাশ) ‘হলিডে মার্কেট’ হিসেবে গণ্য হবে। এ দুই দিন সড়কের অর্ধেক খোলা রেখে বাকি অর্ধেকে হকাররা বসতে পারবেন। হলিডে মার্কেটের সুবিধা রমজান মাসের পর থাকবে না। তখন আবার সলিমুল্লাহ সড়কের ফুটপাতে বসতে হবে সবাইকে। এ ছাড়া অন্য কোনো সড়কে কোনো হকার বসতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধু সড়ক চাষাঢ়া থেকে মন্ডলপাড়া পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। সিটি করপোরেশন অস্থায়ী ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত জায়গায় হকারদের আইডি কার্ড অনুযায়ী পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেবে। হকারদের কাছ থেকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রশাসন, পুলিশ কেউ চাঁদা ও অনুদান আদায় করতে পারবে না বলে অঙ্গীকার করেন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। অঙ্গীকারনামায় তিনি ও হকার নেতা আবদুর রহিম মুন্সী স্বাক্ষর করেন।
এর প্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ শহরের ব্যস্ততম বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত ছেড়ে হকাররা নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে বসতে শুরু করে। ছুটির দিন বিধায় সড়কের দক্ষিণ পাশ পুরোটা জুড়ে হকাররা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। ওই সড়ক হকারদের দখলে থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহনকে ঘুরে অন্য সড়ক দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
এর আগে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থক ও হকারদের হামলায় মেয়র আইভীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ওই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়। দীর্ঘ আট বছর পর হকার সমস্যা সমাধানে সিটি মেয়র আইভী, শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান একসঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নেন।
এতো ঘটনার পর নগরবাসীর দাবী, “নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর এই হকার নামধারী কর্মচারীরা দীর্ঘদিন যাবৎ আসাদ, রহিম মুন্সী, মো. সোহেল, মো. রানা, মো. শাহিনসহ লাইনম্যানখ্যাত চাঁদাবাজদের হাতে প্রতিদিনের চাঁদা তুলে দেওয়ার পর তার প্রতিদিনই বন্টন হতো নানাভাবে। বরাবর ই ওসমান পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহারের পাশাপাশি সদর থানার ওসির নাম ব্যবহার করতো চাঁদাবাজ চক্র । একই সাথে ডিউটিরত পুলিশের সদস্যদের প্রতিদিন নিদ্দিষ্ট অংকের টাকা দিয়ে দেওয়া হতো । যা ছিলো ওপেন সিক্রেট । এখন এই চাঁদা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে ? সেই পুরানো চাঁদাবাজরা এখনো নতুন গডফাদারের নেতৃত্বে নতুন করে সেই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে । যা নগরবাসীর জন্য অব্যাহত দুর্ভোগ প্রতিফলন।”









Discussion about this post