নারায়ণগঞ্জে আজব আজব অনেক ঘটনার খবর প্রায় ই উঠে আসে । রাতারাতি অনেকেই আংগুল ফুলে কলাগাছ বনে যায় এই নারায়ণগঞ্জে ।
সামান্য লেবার থেকে রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে হেলিকপ্টার দিয়ে চলাচল করায় অনেকের চোখ কপালে উঠলেও এখন সহ্য হয়ে গেছে এমন ঘটনা। এবার দৈনিক কালবেলায় উঠে এসেছে একজন দিনমজুর কি করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হলো তার প্রতিবেদন। এমন প্রতিবেদনের পর সেই লেবার মোকাররমের মতো গায়ে বাতাস দিয়ে ঘরে বেড়াবে আজকের প্রতিবেদনের সেই দিনমজুর মুন্সি নেছার আহমেদ রাজু।
বীরের বেশে সকলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিবেন কোন দূর্ণীতির যে সহসাই বিচার হয় না তার ইংগিত।
সেই মুন্সি নেছার আহমেদ রাজু নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন হুবহু তুলে ধরা হলো :
এক সময় মাসিক দুই হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ছোট একটি বাসায় থাকতেন। দিনমজুরি করাসহ টুকটাক আয়ে কোনোমতে চলত তার সংসার। এমনও দিন গেছে, দুই হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিতে পারতেন না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটাতে হয়েছে অনেকবার।
এটা ২০০৮ সালের দিকের ঘটনা। এর ১০ বছর পর ২০১৮ সালে হঠাৎ ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। এরপর থেকে বিস্ময়কর উত্থান। মাত্র ৬ বছরে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। চড়েন কোটি টাকা দামের হেরিয়ার মডেলের গাড়িতে। রূপকথার গল্পের মতো যার উত্থান, তিনি মুন্সি নেছার আহমেদ রাজু। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াআটি মুক্তিনগর এলাকার বাসিন্দা।
মুন্সি নেছার আহমেদ রাজুর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার চৈনপুরে। তার বাবা মৃত মঈনুল হোসেন। রাজুর নিজ এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাঙ্গরা বাজার থানার ২২নং টনকী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি পাল্টা কমিটি করা হয়। সে কমিটির কোনো অনুমোদন ছিল না। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিতেন রাজু। তাতেই ঘুরে যায় তার ভাগ্যের চাকা। নিজ গ্রামের পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়।
সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াআটি মুক্তিনগর এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান জানান, ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে নয়াআটি মুক্তিনগর এলাকায় ডাক্তার শফিকুল ইসলাম মিয়ার বাড়িতে মাসে ২ হাজার টাকায় একটি ঘর ভাড়া করে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন রাজু। তিনি কী কাজ করতেন, তা কেউ জানত না। ঠিকমতো ঘর ভাড়াও দিতে পারতেন না। অনাহারে দিন কাটত স্ত্রী-সন্তানদের। ২০১৮ সালের পর থেকেই তার পরিবর্তন শুরু হয়। শোনা গেছে, তিনি এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এভাবেই তার উত্থান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের রসুলবাগ এলাকায় ৮ কাঠা জমি কিনে মুন্সি ভিলা নামে একতলা বাড়ি নির্মাণ করেন রাজু, যার অনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। উত্তর রসুলবাগ এলাকায় ৬ কাঠা জমিতে ৭ তলা বহুতল ভবন, যার আনুমানিক মূল্য সাড়ে ৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় ১০ কাঠা জমিতে টিনশেড বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। রসুলবাগ কানাপট্টি সংলগ্ন মুরতোলাবাদ এলাকায় ৫ কাঠা জমিতে ৬ তলা ভবন, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। মুক্তিনগর এলাকায় ৬ কাঠা জমির অর্ধেকে টিনশেড, বাকি অর্ধেকে দোতলা ভবন, যার আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি টাকা।
মুক্তিনগর ক্যানেলপাড় এলাকায় ৩ কাঠা জমিতে ৫ তলা ভবন, যার আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি টাকা। মৌচাক এলাকার আলামিন গার্মেন্টস সংলগ্ন ১০ কাঠা জমি, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। নিজ গ্রাম টনকী ইউনিয়নে ২০ বিঘা জমিতে চয়নিকা ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা ও ১০ বিঘা জমিতে মাছের ঘের ছাড়াও রাজুর নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াআটি মুক্তিনগর এলাকায় তার ৫ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে রাজকীয় ফ্ল্যাট করেছেন। ওই ফ্ল্যাটেই তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।
মুন্সি নেছার আহমেদ রাজুর ২২নং টনকী ইউনিয়নের বাসিন্দা আকরাম মিয়া জানান, এক সময়ে রাজু ভাত খেতে ভাত পেত না। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অনুমোদনহীন কমিটির নেতা হওয়ার পরই যেন তিনি আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান। মাত্র কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। তার অত্যাচার-অপকর্মে এলাকাবাসী এতই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার গ্রামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা জানান, এক সময় রাজুর কিছুই ছিল না। মাত্র কয়েক বছরে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এলাকায় তিনি রাজু সাহেব নামে পরিচিত। কোটি টাকা মূল্যের হেরিয়ার মডেলের গাড়ি নিয়ে তিনি বাড়িতে আসতেন। সরকার পতনের পর তাকে এলাকায় আসতে দেখা যায়নি। জুলাই-আগস্ট অন্দোলনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বাঙ্গুরা বাজার থানায় একাধিক হত্যা মামলা হয়েছে। যার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাঙ্গুরা থানার ওসি মাহফুজুর রহমান।
সিদ্ধিরগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে মুন্সী নেছার আহমেদ রাজুকে না পেয়ে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দুর্নীতি করে সম্পদের মালিক হইনি। ব্যবসা করে টাকা কামিয়েছি। এলাকার প্রতিপক্ষ একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমাকে হত্যা মামলার আসাসি করেছে। আমি কোনো অন্যায় কাজে জড়িত নই।’
অবৈধ উপায়ে কোটিপতি বনে যাওয়া নেছার আহমেদ রাজুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, যারাই অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নেছার আহমেদ রাজু কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, আমরা তার খোঁজ নেব।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমরা কাজ শুরু করব। নেছার আহমেদ ছাড়াও যারা অবৈধ উপায়ে সম্পদ করেছেন তাদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হবে।









Discussion about this post