নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সেই চাঞ্চল্যকর ব্রাজিল বাড়ির মালিক ও ফতুল্লার তেলচোর সিন্ডিকেটের শীর্ষ অপরাধী পলাতক আজমেরী ওসমানের অন্যতম সহযোগী টুটুল এখনো রয়েছেঅধরা।
নগরীতে ব্যাপক গুঞ্জন ও অভিযোগ রয়েছে এই তেল চোর টুটুল বিএনপির কয়েকজন অসাধু নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ করে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের আওয়ামী লীগের ৫ আগষ্টে পতন হলে এরপর থেকেই আর দেখা পাওয়া যায়নি শীর্ষ তেলচোর টুটুলের। অথচ বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে আজমেরী ওসমানকে গডফাদার হিসেবে অধিষ্ঠিত করে দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে এলাকায় ধরাকে সরাজ্ঞান মনে করতো এই টুটুল।
একেবারেই ওপেন সিক্রেট ছিলো টুটুলের নগ্ন কর্মকাণ্ড । বিগত ১৫ বছর শামীম ওসমান ও আজমেরী ওসমানকে ম্যানেজ করে যমুনা ডিপোতে সকল ধরনের অপরাধ কার্যক্রম করতেন টুটুল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও দুদকে তদন্ত চলমান থাকলেও কেউ তার পশম ছুতে পারেনি। উল্টো দুদকের কর্মকর্তাদের কোটি টাকায় ম্যানেজ ছাড়াও শামীম ওসমান ও তার ভাতিজা আজমেরী ওসমানের প্রভাব দেখিয়ে দুদক কর্মকর্তাদের ধমক দিয়েও কার্য্য হাসিল করতে মহাপটু ছিলো টুটুল।
সেই টুটুল তেল চরির শত শত কোটি টাকার মালিক হলেও পলাতক অবস্থানে থেকে সকলকে ম্যানেজ করে গ্রেফতার এড়াতে সকল চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
অসংখ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকেও থোরাই কেয়ার করতেন তিনি। যমুনা ওয়েল ডিপোতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তেল চুরির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এই টুটুল।
টুটুলের ভয়ে ভীত হয়ে যমুনা ওয়েল ডিপোর সকল কর্মকার্তা কর্মচারীরা থাকতো টটস্থ।
সবশেষ গত বছরের ৯ এপ্রিল যমুনা ডিপোর ম্যানেজারকে শায়েস্তা করতে টুটল নিজে উপস্থিত থেকে আজমেরী ওসমান ও তার অস্ত্রধারী বাহিনীকে নিয়ে ডিপোতে অবস্থান নেয়। ওই সময় সকলকে হুমকি দিয়ে টুটুল জানান দেয়, তার কথার বাইরে ডিপোর একফোঁটা জ্বালানী তেল নড়চড় হবে না !’
অর্থাৎ নিনেকে ফতুল্লার রাস্ট্রীয় জ্বালানী প্রতিষ্ঠানের মালিক মনে করতেন এই টুটুল।
কোন কর্মকর্তা টুটুলের তেলচুরিতে বাধা হয়ে দাড়ালে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে অস্ত্রের বিশাল মহড়া চলতো প্রকাশ্যে।
ভেতরে তার অফিস ও তার বাড়িতে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে ধরে নিয়ে টর্চার সেলে আটকে রেখে চালানো হতো নির্যাতন। টুটুল ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে আজমেরী ওসমানের নির্দেশে ফতুল্লায় ছাত্র জনতার আন্দোলনে হামলা ও গুলি চালানোর অভিযোগ আছে ।
আর এসব অভিযোগের কারণে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর তার বাড়িতে ফতুল্লাবাসী হামলা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
তবে টুটুল এখনো ফতুল্লার যমুনা ওয়েল ডিপোতে তেলচুরির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং কাগজে কলমে সেখানে অফিসও করেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন।
টুটুলের তেলচুরির হাজার কোটি টাকার সম্পদ টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ৫ আগস্টের পর তদবির করছেন নানা পন্থায়। সকলকেই বিপুল আর্থিক উপঢৌকন পাঠিয়ে ম্যানেজও করেছে ধূর্ত এই টুটুল।
বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় ফতুল্লায় ব্রাজিলের পতাকার আদলে বাড়ি রং করে বাড়ির নাম দেন ব্রাজিল বাড়ি। এঘটনার মাধ্যমে জাতীয় গণমাধ্যমের শিরোনাম হন টুটুল। এর বাইরেও টুটুলের আরেক পরিচয় তিন যমুনা অয়েল ডিপোর ফতুল্লা থানা শাখার শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি ও পরে সভাপতি ছিলো।
জানা যায়, ফতুল্লার স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এই টুটুলের। তাদের সাথে মিলেই ফতুল্লার যমুনা অয়েল ডিপো থেকে তেল চুরির সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন টুটুল। এ কাজ করেই হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান এক ৫০ টাকা দৈনিক রোজের ক্যান্টিন বয় টুটুল।
এই তেলচোরা জয়নাল আবেদীন টুটুলের বাবা মো: রফিক ছিলেন ফতুল্লার পঞ্চবটিতে অবস্থিত রাষ্ট্রয়াত্ব তেল কোম্পানী যমুনা অয়েল কোম্পানীর সিকিউরিটি গার্ড (দারোয়ান)। নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্তব্যপালনরত অবস্থায় তিনি মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে টুটুল যুমনা তেল ডিপোতে অস্থায়ী হিসেবে কাজ পায়। অস্থায়ী ভিত্তিতে (নো ওয়ার্ক নো পে) ডিপোর ক্যান্টিন বয় হিসেবে। তার কাজ ছিল প্লেট ধোয়ার। বিনিময়ে দৈনিক ৫০ টাকা পেতেন। গ্রামের স্কুলে থ্রি-ফোর পর্যন্ত, তারপর ফাইভ-সিক্স নারায়ণগঞ্জের লেখা-পড়ার কথা জানিয়েছেন টুটুল। ক্যান্টিন বয় থেকে এক সময় স্থায়ী চাকরী পেয়ে যান ডিপোর গ্রেজার (তেল মাপার অপারেটর) সেকশনে।
তেল মাপার চাকরী পাওয়ার পর টুটুলকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে তার ভাগ্যের চাকা আশ্চর্যজনকভাবে খুলে যায়। আর অল্পদিনের মধ্যে তেল চুরির বিদ্যা রপ্ত করে ধূর্ত টুটুল। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল চুরির সিন্ডিকেটের সঙ্গে টুটুলের ভূমিকা ছিলো মূখ্য। যমুনা অয়েল কোম্পনীর নিয়ন্ত্রণ করা, তিনজন কর্মকর্তা ও দুইজন সিবিএ নেতার সমন্বয়ে ছিলো ওই সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের ইশারায় বদলী, পদায়ন থেকে শুরু করে সব কিছুই।
আর এই সিন্ডিকেটের কাজে বাধা হলেই টুটুলের ইশারায় টর্চার সেলের নির্যাতন আর অস্ত্রধারীদের মহড়া ছিলো চোখে পরার মতো।
এমন কর্মযজ্ঞের বিষয়ে টুটুলের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল, ম্যাসেজ দিয়ে অসংখ্যবার বক্তব্য চেয়ে অপেক্ষা করার পরও কোন বক্তব্য দেয় নাই টুটুল।
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিশেষ একটি ক্লাবের দুইজন কর্মকর্তা ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের মাধ্যমে প্রশাসন ও বিএনপির নেতাদের ম্যানেজ করেই এখনো অধরা রয়েছেন কুখ্যাত এই অপরাধী।









Discussion about this post