নারায়ণগঞ্জ শহরে চলাচলকারী মৌমিতা পরিবহনের বাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগের শেষ নেই। শহরের ব্যস্ত সড়কে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়াভাবে চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, যানজট সৃষ্টি ও দুর্ঘটনা ঘটানো—সব মিলিয়ে এই পরিবহনটি এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬ অক্টোবর (সোমবার) দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে মৌমিতা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মোজাম্মেল হক (৫৫) নামে এক পথচারী নিহত হন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন দুই ইজিবাইক চালক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইজিবাইকটি রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় মৌমিতা পরিবহনের একটি বাস বেপরোয়াভাবে এসে ইজিবাইকটিকে ধাক্কা দেয় এবং সেটিকে কয়েক গজ দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। স্থানীয়রা চিৎকার করলেও চালক বাস থামাননি। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে বাসটি আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
শহরজুড়ে বিশৃঙ্খল চলাচল
শুধু এই ঘটনাই নয়—প্রতিদিনই মৌমিতা পরিবহনের বাস কোথাও না কোথাও ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যানবাহনের ভেতরেও চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়। ফলে অনেকেই মৌমিতা পরিবহনকে ‘ঘাতক বাস’ বলে অভিহিত করেছেন।
একই সঙ্গে এই পরিবহন শহরের যানজটের অন্যতম কারণ বলেও অভিযোগ উঠেছে। সূত্র মতে, প্রায় ১৬০টি বাস খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের সামনে থেকে প্রতি ৫ মিনিট অন্তর ছেড়ে যায়। ধীরগতিতে চলতে চলতে চাষাঢ়া চত্বরে এসে একের পর এক দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী তুলতে থাকে। এতে একসময় ৪-৫টি বাস পুরো চত্বর দখলে নিয়ে ফেলে, ফলে শুরু হয় তীব্র যানজট। ঢাকা ও ফতুল্লামুখী সড়ক কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে নগরজীবন।
মালিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মৌমিতা পরিবহনের মালিক জাতীয় শ্রমিক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক কালু শেখ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তার রাজনৈতিক প্রভাব ও সংযোগের জোরে এই পরিবহন ঢাকা থেকে রুট পারমিট নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। তখন থেকেই কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শহরজুড়ে দাপটের সঙ্গে চলাচল করে আসছে বাসগুলো।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, পরিবহনটির নিয়ন্ত্রণ আসে বিএনপি নেতাদের হাতে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মৌমিতা পরিবহনও পৃষ্ঠপোষকতার হাতবদল ঘটায়।
নতুন শেল্টারে পুরনো দৌরাত্ম্য
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহরে মৌমিতা পরিবহনের বাসগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন মহানগর যুবদলের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা। তিনি প্রতিদিন বাস মালিকদের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা করে নেন এবং তার অধীনে ছয়জন কর্মী মাঠপর্যায়ে এই পরিবহন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন। তাদেরও প্রতিদিন ‘ক্যাডার ভাতা’ প্রদান করা হয়।
পাশাপাশি মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতাকে মাসিক ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রদান করা হয় বলে সূত্রের দাবি। এই অর্থ পরবর্তীতে ভাগাভাগি করে নেয়া হয় বিভিন্ন পর্যায়ে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন পরিবহনটি বেপরোয়া ছিল, বিএনপি নেতাদের ছায়াতেও তার দৌরাত্ম্য কমেনি—বরং আরও বেড়েছে।
নাগরিক ভোগান্তি অব্যাহত
দুই রাজনৈতিক দলের সময়েই ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা মৌমিতা পরিবহন এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম। প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, যানজট, দুর্ভোগ—সবকিছুর পেছনে এই পরিবহনের অনিয়ম যেন এক স্থায়ী দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও মৌমিতা পরিবহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।









Discussion about this post