মহানগর প্রতিনিধি ॥
অরক্ষিত হয়ে পড়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাংরোডস্থ নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অফিস। সরকারি অফিসের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির আবাসিক কোয়ার্টারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগতদের দখলে। এসব বহিরাগতদের মধ্যে অনেকেই জড়িত মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ফলে সরকারি সম্পদ, অফিসের যানবাহন ও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
হত্যাকাণ্ডেই ফাঁসলো অবৈধ ভাড়াটিয়া কেলেঙ্কারি
গত ১৩ আগস্ট রাতে এ কলোনীর অভ্যন্তরে ঘটে একটি হত্যাকাণ্ড, যা উন্মোচন করে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র।
সেদিন সওজ-এর ভিটিকান্দি সড়ক উপবিভাগের উচ্চমান সহকারী তাহের সরকারের বরাদ্দপ্রাপ্ত বাসায় সাবিনা আক্তার লাকি (৩৬) নামের এক নারীকে হত্যা করা হয়। ওই বাসায় সরকারি কর্মচারী না হয়েও ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিল লাকির পরিবার। পরকীয়ার জেরে তার প্রেমিক নীরব ওরফে নাজিম (৪২) তাকে হত্যা করে পালিয়ে যান। পরে র্যাব-১১ সদস্যরা ঝালকাঠি জেলার নলছিটি থানার তিমিরকাঠি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
এই ঘটনার পরই প্রকাশ্যে আসে—সরকারি কোয়ার্টারগুলো বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেওয়া ও অপরাধীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার চিত্র।
অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়
অফিস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কলোনীতে বসবাসরত বহিরাগতদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো অপরাধে জড়িত। কেউ মাদক ব্যবসায়ী, কেউ চোরচক্রের সদস্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় অপরাধীরা মহাসড়কে অপকর্ম শেষে দ্রুত এ অফিসের ভাড়া নেওয়া বাসায় আশ্রয় নেয়—যা তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
অবসরে গেলেও ছাড়ছেন না বাসা
ওই অফিসের ৩৪টি আবাসিক বাসা মূলত কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ করা হলেও এখন তা নিয়ন্ত্রণ করছে একটি চক্র। অনেক কর্মচারী অবসরে যাওয়ার পরও সরকারি বাসা ছাড়ছেন না; বরং তা ভাড়া বা বিক্রি করে দিচ্ছেন বহিরাগতদের কাছে।
যেমন সম্প্রতি ২৮-বি বাসার বরাদ্দ বাতিলের পর শ্রমিকলীগের অন্তর্ভুক্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উচ্চমান সহকারী জামায়াত উল্লাহ তা ২ লাখ টাকায় বিক্রি করেন ঢাকা সড়ক বিভাগের মাস্টাররোলের কর্মচারী আল-আমিনের কাছে। যদিও জামায়াত উল্লাহ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
১৫ বছর ধরে শ্রমিকলীগের নিয়ন্ত্রণে কলোনী
অভিযোগ রয়েছে—আবাসিক কলোনীর সভাপতি ড্রাইভার মফিজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জামায়াত উল্লাহ গত ১৫ বছর ধরে শ্রমিকলীগের প্রভাব খাটিয়ে পুরো কলোনী নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের টাকা এবং ভাড়ার অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না করে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করছেন তারা।
এছাড়া একাধিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী—হেলপার সাজু মিয়া (৪১-বি), আমির হোসেন (৪৬-বি), ড্রাইভার আব্দুল আলিম (৩৫-বি), পিয়ন মুন্সি আলাউদ্দিন (৩১-বি), ইলেকট্রিশিয়ান গোলাপ মিয়া (৫০-বি), হেলপার আবুল কালাম আজাদ (২৬-বি), জসিম উদ্দিন (২৫-বি) এবং পিয়ন মমতাজ বেগম (৫৪-বি ও ৫৫-বি)—এখনও বাসাগুলো দখলে রেখেছেন। ফলে নতুন কর্মচারীরা সরকারি আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অবৈধ সংযোগ ও বাণিজ্য
জানা গেছে, সওজ অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগও অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রাইভার শহীদ ও নূরুল ইসলামসহ আরও দুজন মিলে চারটি বাসায় অবৈধ সংযোগ দিয়েছেন—যার বিল দিচ্ছে সরকারি বিভাগই।
এ কলোনীতে ৩৯-বি বাসা হোটেল ব্যবসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরকারি নিয়মের চরম লঙ্ঘন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও নতুন নিয়ন্ত্রণ
এক সময় শ্রমিকলীগের প্রভাব থাকলেও বর্তমানে কলোনী নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপি সমর্থিত শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উচ্চমান সহকারী ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ ও সাধারণ সম্পাদক কম্পিউটার অপারেটর সাজ্জাদ হোসেন ভুইয়া। ফলে সরকারি সম্পদ এখন রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বলি হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের উদাসীনতা
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
তবে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান উল্যাহ মজুমদার বলেন, “বহিরাগতদের বসবাসের বিষয়টি আগে আমাদের জানা ছিল না। হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি জানতে পেরেছি। খুব শিগগিরই অবৈধ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ করা হবে।”
বিশ্লেষণ
সরকারি কর্মচারীদের আবাসনের জন্য বরাদ্দকৃত বাসাগুলো ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হওয়া কেবল দুর্নীতিরই নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এসব আবাসিক এলাকা রূপ নেবে অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে।









Discussion about this post