নিজস্ব প্রতিবেদক :
আড়াইহাজারে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।
চাঁদা না দিলে হামলা, মারধর ও হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।
গত কয়েক মাসে এসব ঘটনায় দুইজন নিহত ও একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে। পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
চাঁদা না দিলে হামলা
গত মঙ্গলবার রাতে মাহমুদপুর ইউনিয়নের শ্রীনিবাসদী এলাকায় বস্ত্র ব্যবসায়ী সানাউল্লাহ সানার ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে।
২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ১০–১২ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়।
গুরুতর আহত সানা বর্তমানে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি মাহমুদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমানউল্লাহ আমানের ছোট ভাই ও আমানতশাহ গ্রুপের গ্রে-কাপড় ব্যবসায়ী।
এ বিষয়ে আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে গত ২ অক্টোবর শিবপুর এলাকার ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী সোহেল মিয়াকে দুই লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁর মুখের দুটি দাঁত ভেঙে যায় এবং এক হাত স্থায়ীভাবে অবশ হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমকে প্রধান আসামি করে মামলা হলেও এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
এছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর নারান্দী গ্রামের ইব্রাহিম মিয়া ও তাঁর দুই ছেলেকে চাঁদা না দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে ডেকে কুপিয়ে আহত করা হয়।
চাঁদা না দেওয়ায় মৃত্যুর ঘটনা
গত ২৪ জুলাই খালিয়াচর এলাকার রিপন মিয়াকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কুপিয়ে গুরুতর জখম করে স্থানীয় একদল দুর্বৃত্ত। এক মাস ২২ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৬ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি।
নিহতের স্ত্রী জানান, “স্থানীয় আউয়াল মিয়া, শফিকুল, আরমান, সোহাগ, কবির, রিজভীসহ কয়েকজন চাঁদা দাবি করেছিল। টাকা না দেওয়ায় আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়।”
এছাড়া ৫ অক্টোবর অটোরিকশা চোরকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করায় মারুয়াদী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ইমন মিয়া (২৪) কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হন।
নতুন চক্রের দৌরাত্ম্য
গত বছরের আগস্টে স্থানীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের ছোট ফাউসা এলাকায় শাহীন মিয়ার নেতৃত্বে একটি চক্র নতুন করে সক্রিয় হয়। অফিস স্থাপন করে তারা সালিশ, মাদক কারবার ও বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা আদায় শুরু করে।
এলাকাবাসীর প্রতিবাদে পুলিশ গত মার্চে শাহীনকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার চাঁদাবাজি শুরু করেন।
একইভাবে বিএনপির স্থানীয় নেতা মাসুদ রানা ও পুলিশ কনস্টেবল ইমরান হোসেনকেও এলাকাবাসী গত জানুয়ারিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
অভিযোগ রাজনৈতিক আশ্রয় ও বিচারহীনতার
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই অপরাধীরা বারবার অপরাধ করেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়।
ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন বলেন, “প্রতিনিয়ত মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর দিয়ে তারা মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে ফিরে যাচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে।”
অপরাধের পরিসংখ্যান
পুলিশের তথ্যমতে, গত তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৭টি মামলায় ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১৭ জন, আগস্টে ৬ জন ও সেপ্টেম্বরে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অনীহা
বেশির ভাগ ভুক্তভোগী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পান। স্থানীয়রা বলছেন, “মামলা করলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।”
আড়াইহাজারের সাধারণ মানুষ এখন শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন কাটাচ্ছেন।









Discussion about this post