‘তেল চুরি’, ব্রাজিল বাড়ি ও যমুনা কর্মচারীদের আয়েশি জীবন
সরকারি তেল কোম্পানির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাই এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত ছড়িয়েছে তাঁদের সম্পদের জাল।
বিশেষ প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ছয়তলা ভবন। বাড়ির নাম ‘ব্রাজিল বাড়ি’। দেয়ালে আঁকা ব্রাজিলের পতাকা। ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বাড়িটি দেখে অবাক হয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভেরিয়া জুনিয়র।
বাড়িটির মালিক জয়নাল আবেদীন ওরফে টুটুল—সরকারি যমুনা তেল কোম্পানির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং একইসঙ্গে সিবিএ (শ্রমিক ইউনিয়ন) নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি তেল চুরি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতি।
‘ব্রাজিল বাড়ি’ থেকে বিলাসী জীবনে
জয়নাল আবেদীন এক দশকের বেশি সময় ধরে যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি।
ফতুল্লা ডিপোতে নিজের নামে একটি অফিসও করেছেন তিনি। স্থানীয়দের ভাষায়—“জয়নাল এখন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি।”
সরকারি বেতন মাত্র ৫০ হাজার টাকা, অথচ তাঁর নামে রয়েছে জমি, ফ্ল্যাট, জাহাজ, ট্যাংকলরি—আর ফতুল্লায় ১.৫ কোটি টাকার ‘ব্রাজিল বাড়ি’।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, তাঁর স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত একটি প্রিমিও গাড়িও রয়েছে।
অভিযোগ: ‘তেল মেপে’ টাকা বানানো
যমুনা তেলের ডিপোতে গেজার (তেল মাপার দায়িত্বে থাকা কর্মী) ছিলেন জয়নাল। কর্মকর্তাদের ভাষায়, “তেল মাপার কাজের মধ্যেই সবচেয়ে বড় ফাঁকফোকর।”
অতিরিক্ত তেল বা হিসাবের গরমিল থেকেই কোটি টাকার কারবার চলে।
জয়নালের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ আছে, তিনি খুন মামলার আসামি হয়েও অফিসে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।
চুরির নতুন কৌশল ও তদন্ত
ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনে সরবরাহ শুরু হওয়ার পরও ফতুল্লা ডিপোতে ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল গায়েব হয়।
তদন্ত কমিটি বলছে, এ ঘটনায় জয়নালের ‘যোগসাজশের’ প্রমাণ মিলেছে।
বর্তমানে বিষয়টি তদন্ত করছে বিপিসি, জ্বালানি বিভাগ ও দুদক।
টাইপিস্টের ৪ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট
যমুনা তেল কোম্পানির আরেক কর্মচারী মুহাম্মদ এয়াকুব, পদে টাইপিস্ট। মাসিক বেতন প্রায় ৮৫ হাজার টাকা, অথচ তিনি চট্টগ্রামের খুলশীতে ৪ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে থাকেন।
দুদক বলছে, এয়াকুব ও তাঁর পরিবারের নামে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাটের খোঁজ পেয়েছে তারা।
দুর্নীতির পাহাড়, জবাব নেই কারও
পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির তৃতীয়–চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অনেকেই এখন বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
দুদক ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে, তবে তদন্ত শেষ হতে বছর লেগে যাচ্ছে।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ম তামিমের মতে, “তেল কোম্পানিগুলোর পুরো কাঠামোই অস্বচ্ছ। বেতন দিয়ে এমন সম্পদ সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা দরকার।”
উপসংহার
তেল চুরি, ভুয়া হিসাব ও রাজনৈতিক প্রভাবের জালে জড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় তেল খাত।
সরকারি চাকরি, অথচ কোটি টাকার সম্পদ—প্রশ্ন একটাই, এই টাকার উৎস কোথায় ?









Discussion about this post