মহানগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ, ১৩ নভেম্বর ২০২৫:
রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই—এ কথাটি আবারও সত্য প্রমাণ করেছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব এডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু এবং সাবেক নাসিক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।
দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মনোমালিন্যের পর বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক বৈঠক নারায়ণগঞ্জ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪-এর পর রাজনীতির মোড় ঘোরা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটে বড় পরিবর্তন। বিকেএমইএ ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স দখল ঘিরে তৈরি হয় তীব্র প্রতিযোগিতা।
এ সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন মডেল গার্মেন্টসের কর্ণধার মাসুদুজ্জামান মাসুদ এবং বিকেএমইএ’র বিতর্কিত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
চাঁদাবাজি, প্রভাব খাটানো ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তারা আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জ সদর আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে মাসুদুজ্জামান নানা কৌশল অবলম্বন করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বিএনপির মনোনয়নপত্রও অর্জন করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘মাসুদ’
তৃণমূল বিএনপির অনেক নেতাই মাসুদের আচমকা উত্থান মেনে নিতে পারেননি।
দলীয় নেতাদের অনেকে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আওয়ামী লীগের সরকার ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি ভাইরাল হলে বিতর্ক আরও বেড়ে যায়।
এরপরও পিছু হটেননি মাসুদুজ্জামান। আর্থিক প্রভাব, প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ ও কিছু সুযোগসন্ধানী মহলকে পাশে নিয়ে তিনি মাঠে সক্রিয় থাকেন।
তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও ‘হঠাৎ উত্থান’ নিয়ে বিএনপির ভেতরে-বাইরে চলছে তীব্র আলোচনা।
মনোনয়ন বঞ্চনার পর নতুন কৌশল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত মনোনয়ন না পাওয়ার পর মাসুদুজ্জামান হঠাৎই মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
তিনি বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী একাধিক নেতার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন ও কুশল বিনিময় করেন।
প্রথমে তিনি তিনবারের সাবেক এমপি আবুল কালামের বাসায় যান (যদিও তখন কালাম উপস্থিত ছিলেন না)। সেখানে কালামের মেয়ে ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেত্রী অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এরপর দুপুরে তিনি যান মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর আমলাপাড়ার বাসায়। প্রায় আধঘণ্টা আলাপ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন তারা।
পরে আদালতপাড়ায় বিএনপি আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও এসময় সাখাওয়াত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।
সবশেষে তিনি যান নাসিকের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের বাড়িতে।
সেখানে দেখা হয় আবেগঘন পরিবেশে। খোরশেদ নিজেই মাসুদুজ্জামানকে স্বাগত জানান, বাড়িতে আপ্যায়ন করেন এবং পরবর্তীতে একসঙ্গে মাসদাইর বাজার এলাকায় গণসংযোগও করেন।
নতুন জোট না ‘কৌশলগত পুনর্মিলন’?
এই সাক্ষাৎগুলো নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নির্দেশে ‘অভ্যন্তরীণ ঐক্য’ বজায় রাখার কৌশল হিসেবে মাসুদের এই যোগাযোগ তৎপরতা হতে পারে।
তবে অনেকের মতে, এটি কেবল ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’—যেখানে সবাই বুঝতে পারছেন, নির্বাচনের আগে বিভাজন নয়, ঐক্যই টিকে থাকার একমাত্র পথ।
মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন যারা
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন—
সাবেক এমপি আবুল কালাম,
মহানগর আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান,
সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু,
এবং মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।
এই চারজনের সঙ্গে মাসুদুজ্জামানের একে একে সাক্ষাৎ, রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পুনর্মিলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষণ :
নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে যে বিভাজন ও শীতল সম্পর্ক ছিল, তা হয়তো এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে একধরনের ‘রাজনৈতিক মীমাংসা’র দিকে এগোচ্ছে।
যদিও অনেকে একে ‘নির্বাচনী কৌশল’ বলে ব্যাখ্যা করছেন, তবুও সাখাওয়াত, টিপু ও খোরশেদের মতো প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মাসুদুজ্জামানের ঘনিষ্ঠতা আগামী নির্বাচনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে আমূল বদলে দিতে পারে।









Discussion about this post