নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দুটি প্রজ্ঞাপনে মোট ২৩ জনকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করার পর থেকেই নিয়োগ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং মাঠ-অভিজ্ঞতার অভাব—এ সব বিষয় নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে বিস্তর আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সিনিয়রিটি, মাঠ-অভিজ্ঞতা এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশ—অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রধান বিবেচনায় ছিল না বলে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রজ্ঞাপন প্রণয়নকালে মন্ত্রিপরিষদসচিব ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের পছন্দই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
রাজনৈতিক সংযোগের অভিযোগ
কয়েকজন নবনিযুক্ত ডিসিকে নিয়ে অভিযোগ উঠেছে যে তারা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের ‘বিশ্বস্ত’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। আবার কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও অভ্যন্তরীণ মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই অভিযোগগুলোর কোনওটিই সরকারি নথিতে প্রমাণিত নয়; তবে নিয়োগ-পরবর্তী আলোচনা ও বিতর্কে বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা বা অভিজ্ঞতাহীন কর্মকর্তাদের জেলায় জেলায় পাঠানো হলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে যেখানে ডিসিরাই নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার চূড়ান্ত সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নারায়ণগঞ্জে অভিজ্ঞতা-সংকট নিয়ে আলোচনার কেন্দ্র
সাম্প্রতিক নিয়োগের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে রায়হান কবিরকে ডিসি হিসেবে পদায়ন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। বিসিএস ২৯তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা পূর্বে ইকোনমিক ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে আসেন বলে জানা যায়। প্রশাসনের একাংশের প্রশ্ন—নারায়ণগঞ্জের মতো একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ, শিল্পঘন ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল জেলায় তার মাঠ-অভিজ্ঞতা কতটা যথেষ্ট।
কর্মকর্তাদের একটি অংশ আরও বলছেন, রায়হান কবির ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন—এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত। যদিও এই দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এসপির তুলনায় চার ব্যাচ জুনিয়র—সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে ?
আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়কে কেন্দ্র করে। নারায়ণগঞ্জে বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) বিসিএস ২৫তম ব্যাচের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। অন্যদিকে নবনিযুক্ত ডিসি রায়হান কবির চার ব্যাচ জুনিয়র। নির্বাচনী সময়ে ডিসিই জেলার সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা এবং সকল বিভাগীয় দপ্তরের সমন্বয় করেন।
এক প্রবীণ প্রশাসন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জুনিয়র–সিনিয়র ব্যাচের ব্যবধান সমন্বয়ের কাজে প্রভাব ফেলতেই পারে। বিশেষ করে যখন নির্বাচনী উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।”
এসএসবি সুপারিশ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হলো ?
সাধারণত ডিসি নিয়োগে এসএসবি বা সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড কর্মকর্তাদের নানা দিক—অভিজ্ঞতা, মাঠ-পরিচালনা, নেতৃত্বগুণ, পূর্বের রেকর্ড—এসব বিচার করে তালিকা তৈরি করে। কিন্তু এবার অনেক ক্ষেত্রে এসএসবি সুপারিশের বাইরে গিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। যদিও এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনের আগে নীতি-নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
বেশিরভাগ জেলার ডিসি নির্বাচনী দায়িত্বে রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকায় থাকেন। তাদের দায়িত্বের মধ্যে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, নিরাপত্তা প্রস্তুতি, ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রমসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে।
এমন অবস্থায় পর্যাপ্ত মাঠ-অভিজ্ঞতা নেই—এমন অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে নির্বাচনবিশেষজ্ঞরা গোলযোগ বা প্রশাসনিক অদক্ষতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষত বিএনপির পক্ষ থেকে প্রথম দফার নিয়োগেই আপত্তি তোলার পর সাম্প্রতিক দ্বিতীয় দফা নিয়োগ আরও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সরকারের অবস্থান কী ?
অফিসিয়াল সূত্র এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ স্বীকার করেনি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে—“ডিসি নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মদক্ষতা ও সরকারের নীতি অনুসারেই করা হয়েছে। সিনিয়রিটি একমাত্র মানদণ্ড নয়।”
তবে বিতর্ক প্রসঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং এখনো দেওয়া হয়নি।
উপসংহার
নতুন ডিসিদের নিয়োগ দেশের প্রশাসনে নতুন করে মূল্যায়ন, বিতর্ক ও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় অভিজ্ঞতাহীন কর্মকর্তা নিয়োগ এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের বিতর্ক প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
পরিস্থিতি স্বচ্ছভাবে পরিষ্কার করতে এবং বিতর্কের অবসান ঘটাতে সরকারের উচিত নিয়োগ-প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা—এ মত দিয়েছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।









Discussion about this post