নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের চারটিতেই এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন মুখ।
বাদ পড়েছেন কয়েকবারের সাবেক সংসদ–সদস্য, আলোচিত হেভিওয়েট নেতারা।
এই পরিবর্তন জেলা জুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা তিনটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে এখনো মাঠে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির একটি সূত্র জানায়, নতুনদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা এবং ‘সততা ও গ্রহণযোগ্যতা’। মনোনয়ন পাওয়ার পর মাঠে সরব হয়ে উঠেছেন নতুন প্রার্থীরা। তাদের দাবি, বঞ্চিতদের আন্দোলন দলের ‘ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী কৌশলকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থীরা
নারায়ণগঞ্জ–১ (রূপগঞ্জ): মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপু — সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স; যুগ্ম আহ্বায়ক, জেলা বিএনপি।
নারায়ণগঞ্জ–২ (আড়াইহাজার): নজরুল ইসলাম আজাদ — কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
নারায়ণগঞ্জ–৩ (সোনারগাঁ–সিদ্ধিরগঞ্জ): আজহারুল ইসলাম মান্নান — কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য; সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান।
নারায়ণগঞ্জ–৫ (সদর–বন্দর): মাসুদুজ্জামান মাসুদ — সাবেক সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার; ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী।
নারায়ণগঞ্জ–৪ (ফতুল্লা) আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। ধারনা করা হচ্ছে, জোটগত সমঝোতার অংশ হিসেবে আসনটি শরিক দলের জন্য ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ–১: দুইবারের প্রার্থী মনির মাঠের বাইরে
২০০৮ ও ২০১৮ সালে পরপর দুই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া কাজী মনিরুজ্জামান মনির এবার মনোনয়ন না পেয়ে সমর্থকদের নিয়ে নীরব অবস্থানে। মাঠে দলীয় প্রার্থীর জন্য তাদের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় নেতাদের মতে, এখানকার পরিস্থিতি এখনো ‘নেতিবাচক সংকেত’ দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ–২: চার বঞ্চিত প্রার্থীর লাগাতার আন্দোলন
আড়াইহাজারে দলীয় প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রয়েছেন চার বঞ্চিত নেতা—সাবেক সাংসদ আতাউর রহমান আঙ্গুর, কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুর রহমান সুমন, পারভীন আক্তার এবং যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক নেতা নুরুল ইসলাম নুরু।
দুই সপ্তাহ ধরে তারা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মশাল মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে যাচ্ছেন।
আঙ্গুরের দাবি, “তৃণমূল ভালো মানুষকে চান। প্রার্থী পরিবর্তন জরুরি।”
অন্যদিকে দলীয় প্রার্থী নজরুল আজাদ জানান, “১৭ বছরের রাজনৈতিক মূল্যায়নেই দল আমাকে বেছে নিয়েছে। যারা এখন আন্দোলন করছেন, তারা অতীতে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন না।”
নারায়ণগঞ্জ–৩: সাত মনোনয়ন প্রত্যাশীর যৌথ চিঠি
সোনারগাঁ–সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে মনোনয়নের বিরুদ্ধে সাতজন সম্ভাব্য প্রার্থী যৌথভাবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে চিঠি দিয়েছেন।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন—
সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম, সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, সাবেক পরিচালক ওয়ালিউর রহমান আপেলসহ আরও চারজন।
মনোনীত প্রার্থী মান্নান বলেন, “জেল-জুলুম আর নির্যাতনের মাঝেও আন্দোলন করেছি। এজন্যই দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। এই আসনটি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে উপহার দিতে চাই।”
নারায়ণগঞ্জ–৫: চার বঞ্চিত নেতার সরব অবস্থান
সদর–বন্দর আসনে ব্যবসায়ী নেতা মাসুদুজ্জামান মাসুদকে মনোনয়ন দেওয়ার পর মাঠে নেমেছেন চার আলোচিত বঞ্চিত নেতা—
সাবেক সাংসদ অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, প্রাইম গ্রুপের এমডি আবু জাফর আহম্মেদ বাবুল, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
মনোনীত প্রার্থী মাসুদ জানান, “দলের জন্য আমার ত্যাগ ও সামাজিক কার্যক্রম যাচাই করেই কেন্দ্রীয় নেতারা মনোনয়ন দিয়েছেন। যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কাজ করছেন তারা মূলত তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অমান্য করছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: কৌশলগত মনোনয়ন নাকি অভ্যন্তরীণ বিভাজন ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে নতুন মুখ প্রাধান্য পাওয়ায় নেতৃত্বের জেনারেশন শিফটের ইঙ্গিত মিলছে। তবে বঞ্চিতদের আন্দোলন নির্বাচনের আগে দলের ঐক্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির ভেতরের একটি অংশ মনে করছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ‘কৌশলগত সমন্বয়’ হিসেবে কিছু আসনে পরিবর্তন আসতে পারে—যার ফলে বঞ্চিতদের আন্দোলন এখনো থেমে নেই।
শেষ কথা
মনোনয়ন পরবর্তী নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উত্তাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন স্পষ্ট। নতুন মুখের উত্থানকে স্বাগত জানালেও বঞ্চিতদের চাপা ক্ষোভে জেলা বিএনপির ভেতরে বিরোধ প্রকট হয়ে উঠছে—যার প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।









Discussion about this post