নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ শহর যেন আজ একটি “অফিশিয়ালি লাইফ সাপোর্টে থাকা” নগরী। রাস্তাজুড়ে হকারের দখল, ফুটপাত ভরাট, অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল, আর সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘদিনের খণ্ডিত ও অনিয়ন্ত্রিত ড্রেন সংস্কার—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আজ চরম ভোগান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
শহরের প্রধান সড়ক, মার্কেট এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলি—সব জায়গায় দখল, যানজট ও কাজের বিশৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিদিন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে; বর্ষা এলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ঘর-মার্কেট-দোকান সবকিছু থামিয়ে দেয়।
নেতাদের নীরবতা—নাগরিকদের ক্ষোভ
নাগরিকদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ নেতাই শহরের এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো নিয়ে ‘মুখে তালা’ মেরে রেখেছেন। কেউ কেউ লোক দেখানো বক্তব্য দেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেন না। নাগরিকদের দুর্ভোগ, শিশু-বয়স্কদের কষ্ট, যানজট—সবকিছু যেন তাদের কাছে গুরুত্বহীন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ক্ষোভ। অনেকে বলছেন, “শহর মরছে, আর নেতারা ছবি তুলছে, উদ্বোধন করছে, পোস্ট দিচ্ছে।”
নাগরিকদের বড় দুর্বলতা—অতিরিক্ত নির্ভরতা
শহরের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোন রাজনৈতিক নেতা কখন কথা বলবেন, কোন ছাত্র-যুবনেতা আন্দোলন করবেন—এসবের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে নগরবাসী।
এই নির্ভরতার সংস্কৃতিকে অনেকেই শহরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়রা বলছেন—“নারায়ণগঞ্জের সমস্যা সমাধান করবে নারায়ণগঞ্জবাসী ছাড়া আর কেউ নয়। যাদের কাছে আমরা আশা করি, তাদের অনেকেই বিভিন্ন স্বার্থে সমস্যাগুলো ‘জিইয়ে’ রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।”
ড্রেন সংস্কারের বিশৃঙ্খলা—রাস্তায় ধ্বংসাত্মক প্রভাব
শহরের ড্রেন সংস্কারের কাজ চলছে বছরের পর বছর, কিন্তু পরিকল্পনার অভাব, নিম্নমানের তদারকি ও অসমাপ্ত গর্তে রাস্তাঘাট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা কাদায় পরিণত হয়; দোকানপাট, অফিস—সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়ে।
হকার দখল ও অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা
বেশির ভাগ প্রধান সড়ক ও ফুটপাত হকারে ভরাট।
অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচলে প্রতিদিন ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
ট্রাফিক ব্যবস্থাও কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন। দূর্ণীতি পরায়ণ।
নাগরিকদের দাবী—‘নিজেরা চাপ না দিলে কিছুই বদলাবে না’
বিশ্লেষকদের মতে, শহরের এই দুরবস্থা থামাতে প্রয়োজন সংগঠিত নাগরিক চাপ ও দাবি।
যখন নগরবাসী আন্দোলন বা দাবি তুলতে শুরু করেন, তখনই রাজনৈতিক নেতাদের সক্রিয়তা দেখা যায়। তাই শহর বাঁচাতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ জরুরি।
সমাধানের পথে ৫টি জরুরি সুপারিশ
১. সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে সমন্বিত ড্রেন সংস্কার পরিকল্পনা ও দ্রুত কাজ শেষ করা।
২. মহানগরে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ ও সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত করা।
৩. অটোরিকশা—ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক পরিকল্পনা।
৪. নাগরিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে নিয়মিত চাপ তৈরির উদ্যোগ।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ।
শেষ কথা
নারায়ণগঞ্জের শহর আজ সংকটে।
এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব—যদি নাগরিকরা নিজের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসেন, সক্রিয় চাপ সৃষ্টি করেন এবং শহরকে বাঁচানোর সংগ্রামে নিজের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেন।
কারণ—“এই শহর আমাদের, আর শহরটাকে বাঁচানোর দায়িত্বও আমাদের।”









Discussion about this post