নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের খানপুরে ওয়াসা ভবনের ভেতরে বিএনপির নেতাদের ‘টর্চার সেলে’ সিকিউরিটি গার্ড আবু হানিফকে (৩০) পিটিয়ে হত্যার এক মাস পার হলেও মামলার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত অভি এখনো অধরা।
ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও পলাতক অভিকে বিভিন্নভাবে ‘শেল্টার’ দিয়ে পালাতে সহায়তা করছে একটি প্রভাবশালী চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ‘ম্যানেজমেন্ট’ গুঞ্জন
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, অভিকে বাঁচাতে এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী একটি চক্র সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। বিশেষ করে বিএনপি–ঘরানার স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ‘রাজি’ নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে খানপুরজুড়ে।
অভি ও অন্যান্য আসামির পরিবার নাকি কয়েক লাখ টাকা দিয়ে নিহতের পরিবারকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টাও করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে এলাকাবাসীর। তবে নিহতের পরিবার এসব প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানা গেছে।
কীভাবে ঘটল হত্যাকাণ্ড
গত (২০ অক্টোবর) দুপুরে ইতু ভিলার সিকিউরিটি গার্ড হানিফকে নিজ বাসা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনে অভি ও তার সহযোগীরা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের বোন জয়নাব ওরফে রাবেয়া জানান, “অভি এসে আমার ভাইকে বিছানা থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। দেয়ালে মাথা ঠুকে দেয়। পরে জোর করে ওয়াসার জোড়া পানির ট্যাংকির ভেতরে নিয়ে যায়।”
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেধড়ক পিটিয়ে হানিফকে হত্যা করা হয়। অভিযুক্তদের দাবি—হানিফ একটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শিশুটি ও তার পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি।
পরিবারের বক্তব্য : মারধর, হুমকি, অপমান
নিহতের ভগ্নিপতি ইবরাহিম বলেন, “আমাদেরও ট্যাংকির ভেতর ডেকে নেন অভি। আমাকে চড়-থাপ্পড় মারে, লুঙ্গি টান দেয়, গালাগাল করে, টাকা দাবি করে। না দিলে বিভিন্ন হুমকি দেয়।”
তিনি আরও জানান, কিছু সময় পর জানতে পারেন হানিফকে অচেতন অবস্থায় একটি অটোরিকশায় তুলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হানিফ তিনটি শিশু সন্তানের জনক—বড়টির বয়স মাত্র ছয় বছর, মেঝো দেড় বছরেরও কম, আর ছোট সন্তানের বয়স মাত্র ছয় মাস।
টর্চার সেল পরিচালনার অভিযোগ
খানপুরের বহু বাসিন্দা দাবি করেছেন, ওয়াসার এই জোড়া ট্যাংকির ভেতর দীর্ঘদিন ধরেই অভি ও তার অনুসারীরা একটি ‘টর্চার সেল’ পরিচালনা করে আসছে বিএনপির প্রভাবশালী একটি চক্রের শেল্টার নিয়ে। সেখানে আগেও মানুষ ধরে এনে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি।
এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দার ভাষায়, “সরকারি জায়গায় এমন নির্যাতনকেন্দ্র চলবে, আর প্রশাসন জানবে না—এটা বিশ্বাস করা কঠিন।”
পুলিশের অবস্থান
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন বলেন, “হানিফ হত্যায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। পলাতক অভিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এটি যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সে প্রাথমিক ধারণা আমরা পেয়েছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।”
তবে পলাতক অভির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব তদন্তকে প্রভাবিত করছে কিনা—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
এক মাসেও অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ
এক মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয়রা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ—অভি ও তার গোষ্ঠী বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পুলিশ কেবল “চলছে অভিযান”—এ বক্তব্যেই থেমে আছে।
শেষ কথা
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে টর্চার সেল, প্রকাশ্যে মারধর করে হত্যা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং বিচারপ্রক্রিয়া ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে হানিফ হত্যাকাণ্ড এখন নারায়ণগঞ্জে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত অভিকে গ্রেপ্তার করে পূর্ণ তদন্ত সম্পন্ন করা হোক এবং হানিফের পরিবারকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।









Discussion about this post