নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ যেন আজকাল খুবই ব্যস্ত—মাঝে মাঝেই নতুন নতুন ‘উদ্ভাবন’। এবার তো ভাড়া করা মালবাহী জাহাজই কেটে বিক্রি করার অভিযোগ! ঠিক শুনেছেন—ভাড়া নেওয়া জাহাজ।
যেটা মানুষ সাধারণত চালায়, মাল বহন করায়; কিন্তু এখানে সেটা কেটে টুকরা টুকরা করে বিক্রিই হয়ে গেছে। যেন এটাই স্বাভাবিক বাণিজ্য।
এ ঘটনায় জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি শাহাদাত হোসেনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেফতারও হয়েছে নজরুল ইসলাম নামে বিএনপি–ঘেঁষা আরেক কর্মী—যাকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা গা-ঢাকা দিয়ে আছেন, হয়তো পরবর্তী ‘প্রোজেক্ট’-এর পরিকল্পনায় ব্যস্ত।
ভাড়া নয়, যেন সরাসরি মালিকানা—এভাবেই কাটা হয়েছে জাহাজ
জানা যায়, পিরোজপুর ইউনিয়নের কাদিরগঞ্জে গত ১৫ দিনে এইচবি হারুন অ্যান্ড ব্রাদার্সের মেঘনা শিপইয়ার্ডে ভাড়া নেওয়া জাহাজটি দিব্যি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। যেন কেউ তাদের হাতে চাবি আর কাটা-ঘর দুই-ই তুলে দিয়েছে।
গ্রেফতার নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালির হাতিয়া। কিন্তু কাজকাম চলেছে নারায়ণগঞ্জে—‘জাতীয়’ পর্যায়ের এই কাটাছেঁড়া ব্যবসার তো আর সীমানা থাকে না!
বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম বিডিআর ও শাহাদাতের ‘সুপার সিন্ডিকেট’
অভিযোগ উঠেছে—সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম বিডিআর এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি শাহাদাত হোসেন মিলে একেবারে পেশাদার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
তারা ১ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ‘ডাম্ব বার্জ (ডিবি)’ নামের জাহাজটি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকায় এক মাসের জন্য ভাড়া নেন।
এরপর যা ঘটল তা দেখে মনে হয়েছে—মাসিক ভাড়া না, বরং স্থায়ী মালিকানা পেয়েছে!
শাহাদাতের নেতৃত্বে ১০–১৫ জনের দল—জাফর, ইকবাল, নজরুল, এমদাদ, জাফর মিয়া, হোসেন—মিলে জাহাজটিকে কাদিরগঞ্জে নিয়ে সরাসরি স্টিল প্লেটে রূপান্তর করে ফেলেন।
ভাবখানা এমন—জাহাজ ভাড়া নিয়েছি তো, ইচ্ছা করলে কেটে বিক্রি করতেও পারি!
ক্ষতির পরিমাণ শুনলে মাথা ঘুরে যাবে
জাহাজের মালিক রাকেশ শর্মা রবিবার সকালে ফোনে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন—তার জাহাজ কাটা পড়েছে, কাজ প্রায় শেষ। তার দাবি—ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
রাকেশের অভিযোগ স্পষ্ট—জাফর মাল পরিবহনের নামে জাহাজ ভাড়া নিলেও পরে বিএনপি নেতা–কর্মীদের একটি সিন্ডিকেট দিয়ে পুরো জাহাজটাই বিক্রি করে ফেলা হয়।
শাহাদাতের বাবা রফিকুল ইসলাম বিডিআর নাকি ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সে প্রতিশ্রুতিও শেষমেশ কাগজে-কলমে হারিয়ে গেছে—মামলাই হয়েছে।
‘সমঝোতা চলছে’—শিপইয়ার্ডের মালিকের রহস্যজনক বক্তব্য
সিন্ডিকেটে নাম আসা বিএনপি নেতা ও শিপইয়ার্ডের মালিক রফিকুল ইসলাম বিডিআর জানিয়েছেন—
“বিষয়টি জানার পর জাহাজ কাটা বন্ধ করা হয়েছে।”
কিন্তু তখন পর্যন্ত তো জাহাজের বেশিরভাগই কাটা হয়ে গেছে!
এ যেন অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিস বলছে—“আগুন নিভে গেছে, ধোঁয়া থামানোর চেষ্টা চলছে।”
পুলিশ বলছে—মামলা হয়েছে, অভিযান চলছে
সোনারগাঁ থানার তদন্ত পরিদর্শক মো. রাশেদুল হাসান খান জানান—জাহাজ কেটে বিক্রির ঘটনায় মামলা নেয়া হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত নজরুলকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।
শেষকথা
ঘটনাটি পড়ে মনে হয়—নারায়ণগঞ্জে জাহাজ ভাড়া নেওয়া মানে যেন খোলা চুক্তি:
“ভাড়া নিলাম, এখন কাটবো—আপনার জাহাজ, আমাদের ইচ্ছা!”
সোনারগাঁয়ের এই ‘জাহাজ কাটাখোর সিন্ডিকেট’ দেখিয়ে দিল—যথাযথ পরিকল্পনা, দলবল আর কিছু রাজনৈতিক ছায়া থাকলে ভাড়া জিনিসও কেটে বিক্রি করা সম্ভব !









Discussion about this post