নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন—স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘জালাল মামা’—সম্প্রতি গা–ঢাকা দিয়েছেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকটি মামলায় তার নাম আসার পর থেকেই তিনি এলাকায় অনুপস্থিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ক্ষমতার কেন্দ্রে উত্থান
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের আত্মীয়তার সূত্রেই সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় দ্রুত ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন জালাল উদ্দিন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই তিনি ‘জালাল মামা’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে রাজনীতি, ব্যবসা ও স্থানীয় নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তার করেন।
শিমরাইল টেকপাড়ায় অবস্থিত জেএমএস গ্লাস ফ্যাক্টরি ছিল তার মূল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ—ব্যবসার পাশাপাশি তিনি এলাকায় বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, জমি–সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ—সবকিছুর মধ্যেই প্রভাব খাটাতেন। একই সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস ও বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব চালাতো বীরের বেশে।
স্থানীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব
সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে থানা আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিয়মিতভাবে জালাল উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। অনেকেই দাবি করেন, তিনি রাজনৈতিক অবস্থান ও বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ‘নির্ণায়ক প্রভাব’ বিস্তার করতেন।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, কোন মাসে নেতাকর্মীরা তার সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হলে বা আর্থিক সুবিধা দিতে না পারলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তেন। এমনকি তার সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রক্ষা করাকে রাজনৈতিক টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
অভিযোগের পাহাড় :
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, আলোচিত নুর হোসেনের উত্থান–পতনেও জালাল উদ্দিন পরোক্ষভাবে সুবিধা পেয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। নুর হোসেনের পালিয়ে যাওয়ার পর তার মালিকানাধীন একটি মাইক্রোবাস জেএমএস ফ্যাক্টরি থেকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এছাড়া মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহন চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল—এমন অভিযোগও স্থানীয়দের বক্তব্যে পাওয়া যায়। ফতুল্লা ও এর আশপাশের এলাকাতেও তার প্রভাব বিস্তার ছিল বলে দাবি করেন অনেকেই।
ওয়ার্ড–ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের দখল
নাসিকের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন প্রভাব বজায় রেখেছিলেন জালাল উদ্দিন—এমন অভিযোগ করে স্থানীয়রা বলেন, এলাকার বেশ কিছু ব্যবসা, বালু ও পাথর পরিবহন, মহল্লা–নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন। এমনকি কোরবানির ঈদের হাট ব্যবস্থাপনায়ও তার নাম পোস্টারে পাওয়া যেত—যা নিয়ে তখন নানা আলোচনা হতো।
নীরবতা ও ভয়ের সংস্কৃতি
সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বলেন, প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউই পেতেন না। শামীম ওসমানের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়তার সূত্রে তিনি প্রকারান্তরে ‘অপ্রকাশ্য ক্ষমতাধর ব্যক্তি’র অবস্থানে ছিলেন বলেও স্থানীয়দের অভিমত।
৫ আগস্টের পর গা–ঢাকা
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে জালাল উদ্দিন আর এলাকায় দেখা যাচ্ছে না বলে জানান একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা। তার অবস্থান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্তের দাবি
সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করেন—সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও অনেক তথ্য উন্মোচিত হতে পারে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার নানা অস্থিরতা, চাঁদাবাজি ও স্বার্থকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।









Discussion about this post