নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
২ ডিসেম্বর ২০২৫
নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত রাজনৈতিক দলের মতবিনিময় সভায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু প্রকাশ্যে তার গ্রেপ্তার দাবি করায় এই সমালোচনা ঘনীভূত হয়।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বিষয়টি নিশ্চিত করলেও—টিপুর বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি। ফলে বক্তব্যটি সভাকক্ষে মুহূর্তেই তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়।
টিপুর প্রকাশ্য অভিযোগ
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে টিপু সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেন। তিনি দাবি করেন—
মোহাম্মদ আলী মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছেন।
বক্তাবলীতে ২৯ নভেম্বরের একটি অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী নিজেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন।
অতীতে আদমজী জুট মিলের শ্রমিকদের বেতন সংক্রান্ত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত’ পরিচিতির কথা টিপু উল্লেখ করেন—যা তিনি অভিযোগ হিসেবে সভায় উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, “ওকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। যদি কেউ বয়কট না করেন, আমরাই বয়কট করবো।”
টিপু আরও দাবি করেন, আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি স্মরণ করে তিনি “ফ্যাসিস্টের দোসর”–দের প্রশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বসে থাকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতাদের উদ্দেশে তিনি মোহাম্মদ আলীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের দাবিও জানান।
বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালল ভাইরাল ভিডিও
দিন কয়েক আগেও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মোহাম্মদ আলীর দেয়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ নিয়ে তুমুল আলোচনার মাঝেই প্রকাশিত হয় টিপু ও মোহাম্মদ আলীর হাস্যোজ্জ্বল কথোপকথনের একটি ভিডিও, যা আরও বড় বিতর্ক সৃষ্টি করে।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—যার বিরুদ্ধে এমন তীব্র অভিযোগ, তার সঙ্গে টিপুর সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের ভিডিও কেন প্রকাশ পেল?
এই দ্বৈত অবস্থান নিয়েই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও সমালোচনা দেখা দেয়।
আগের অভিযোগগুলোর পুনরুত্থান
আজ মঙ্গলবারের মতবিনিময় সভায় গ্রেপ্তারের দাবি ওঠার পর আবারও সামনে আসে মোহাম্মদ আলীকে ঘিরে পুরোনো বিতর্কগুলো। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি—একসময় পঞ্চবটির একটি মিল কারখানায় স্বল্প বেতনের কর্মী হিসেবে পরিচিত থাকা মোহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নিজেকে ‘কিং–মেকার’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত’ নামক কেলেংকারী গোছাতে নানা পন্থায় একেক সময় একেক নাটক মঞ্চায়ন করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ আলী।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সূত্রে বিভিন্ন সুবিধা নেয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে বিএনপি–ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও স্থানীয় মহলে প্রচলিত।
এমন প্রেক্ষাপটে ২৯ নভেম্বরের এক অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী নিজেকে এমপি প্রার্থী ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিসিক শিল্প এলাকার বিশাল ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণকারী কুখ্যাত এক অপরাধী যিনি যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত এমন এক ঝুট সন্ত্রাসী নেপথ্যে থেকে বিতর্কিত নয় লাইখ্যা ডাকাত সর্দার মোহাম্মদ আলীকে আরো বিতর্কে ফেলতে অপর একজন বিএনপির নেতার দুই ভাইকে ঝুটের ব্যবসা দিয়ে তুষ্ট করে এমন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
ডিসির প্রতি টিপুর আহ্বান
মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে টিপু বলেন—“আপনি নিরপেক্ষ থাকবেন, আইন–শৃঙ্খলা ঠিক রাখবেন। আমরা সহযোগিতা করবো। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হতে দেবো না।”
মোহাম্মদ আলীর পক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী বা তার ঘনিষ্ঠ মহলের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক মাঠে তীব্র প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—টিপুর প্রকাশ্য গ্রেপ্তার দাবি, আগের বিতর্কিত ভিডিও, পুরোনো অভিযোগগুলোর পুনরুত্থান, সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
এই বিতর্ক আগামী নির্বাচনী সময়ে কী প্রভাব ফেলবে—সেটি এখনই বলা কঠিন। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি যে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে, তা স্পষ্ট।









Discussion about this post