রূপগঞ্জ সংবাদদাতা :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাত্র একটি মোবাইল ফোন ও অনলাইন গেম ফ্রি ফায়ার–এর আইডি কেনার জন্য দুই বন্ধুকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ডাকাতির নাটক সাজিয়েছে এক কিশোর—এমন ঘটনার কথা শুনলে যে কেউ হতবাক হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার ও কিশোর অপরাধের ভয়াবহ রূপ এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
পুলিশ শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাতে তিন কিশোরকে গ্রেফতারের পর বিষয়টির আসল চিত্র উদঘাটন করে। শনিবার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। উদ্ধার করা হয়েছে নগদ দুই লাখ ৭৮ হাজার টাকা ও দুই ভরি স্বর্ণালংকার।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী—অপরাধের ছকে
গ্রেফতার এক কিশোরের বাবা ক্ষোভ ও লজ্জায় বলেন, “আমার ছেলে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কিছু বখাটে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে এ কাজ করেছে। মোবাইল আর গেম খেলার নেশায় তারা এই অমানবিক নাটক সাজিয়েছে।”
এতেই বোঝা যায়, কিশোরদের অবাধ স্মার্টফোন ব্যবহার ও অনলাইন গেমের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব পরিবারে কতটা ঝুঁকি তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা যখন পাঠ্যপুস্তক নয়, গেমের চরিত্র আর অনলাইন আইডির পেছনে জীবন নষ্ট করছে—তখন বিপদ শুধু তাদের নয়, পুরো পরিবার ও সমাজের।
২৪ নভেম্বরের নাটকীয় ‘ডাকাতি’—আসলে পরিকল্পিত প্রতারণা
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, “২৪ নভেম্বর দুপুরে কাঞ্চন এলাকায় এক কিশোরকে হাত-পা বেঁধে মারধর করে আলমারি ভেঙে ১০ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার “লুট” করেছে—এই অভিযোগে কিশোরের বাবা থানায় মামলা দিয়েছিলেন। পরে তদন্তে জানা যায়, সবই সাজানো। নিজেরাই নাটক করে পরিবারকে বিপদে ফেলেছে তারা।”
নতুন মোবাইল দেখেই ফাঁস হয় চালাকি
শুক্রবার রাতে এক কিশোরের হাতে নতুন মোবাইল ফোন দেখে সন্দেহ করে তার পরিবার। চাপের মুখে কিশোর টাকার উৎস জানালে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। স্থানীয়রা তিন কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা সব স্বীকার করেছে।
সমাজের জন্য ভয়ংকর সতর্কবার্তা
এই ঘটনা কেবল এক পরিবারের ক্ষতি নয়—এটি সমাজের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
– অনলাইন গেমের নেশা
– কিশোরদের বেপরোয়া বন্ধুমহল
– অবাধ মোবাইল ফোন ব্যবহার
– অভিভাবকের নজরদারির অভাব
এসব মিলে শিশু-কিশোরদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। কিশোর বয়সে এমন কাণ্ড করতে পারলে বড় হলে তারা কোন পথে যাবে ?
সামাজিক অনিয়ম, পারিবারিক অবহেলা ও প্রযুক্তির অপব্যবহার যখন এক বিন্দুতে মিলিত হয়—তখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীও হয়ে ওঠে ‘ডাকাতি নাটকের পরিচালক’।
কঠোর নীতিমালা ও পারিবারিক নজরদারি জরুরি
এই ঘটনার পরিণতি দেখে বোঝাই যায়, কিশোরদের মোবাইল ব্যবহার ও অনলাইন গেম নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নয়, পরিবারের পক্ষ থেকেও কঠোর নজরদারি অপরিহার্য। নইলে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য।
রূপগঞ্জের এই ঘটনা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—কিশোর অপরাধের মূল জন্মস্থল এখন ঘরের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে, আর সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এর ভয়াবহতা আগামী দিনে আরও মারাত্মক হয়ে উঠবে।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ :
রূপগঞ্জে দিনদুপুরে ঘরে ঢুকে শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে ১০ ভরি সোনা ও ১০ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে ডাকাত দল। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) আব্দুর রশিদ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় অভিযোগ করেন। এর আগে সোমবার (২৪ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার কাঞ্চন পৌর ভবন সংলগ্ন এক বাড়িতে এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই শিক্ষার্থীর নাম তমো ইসলাম। সে উপজেলার কাঞ্চন পৌর এলাকার আব্দুর রশিদের ছেলে এবং কাঞ্চন ভারত চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
তমো জানায়, তার বাবা আব্দুর রশিদ উপজেলার ভোলাবো ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ওমেদার। ঘটনার সময় তিনি অফিসে ছিলেন। বোনকে নিয়ে তার মা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। তমো তখন ঘরে একাই অবস্থান করছিল। এ সুযোগে ডাকাতদল মুখোশ পরা অবস্থায় পরিকল্পিতভাবে তাদের বাড়ির তিনতলায় প্রবেশ করে। সেখানে কৌশলে তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন তারা। পরে তমোর হাত-পা-মুখ বেঁধে ১০ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়।
রূপগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোক্তার হোসেন জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান।









Discussion about this post