নিজস্ব প্রতিবেদক :
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির দেওয়া সাম্প্রতিক মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। মনোনয়ন পাওয়া মুজিবুর রহমানকে ঘিরে অতীতের সহিংস রাজনৈতিক ইতিহাস, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ পরিবারের শেকড় এবং সাম্প্রতিক বিদেশ সফরে বিতর্কিত মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ পুরো ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দলের তৃণমূলের প্রশ্ন—“যে মহল বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালানোর অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত, আজ তাদের ছায়ায় থাকা ব্যক্তিকে কেন ধানের শীষ দেওয়া হলো ?”
১৯৯৮ সালের কাঁচপুর সেতু—বিএনপিচেয়ারপারসনের গাড়িবহরে গুলি: কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ওসমান পরিবার’
১৯৯৮ সালে টিপাইমুখ বাঁধের প্রতিবাদে বিএনপির লংমার্চ চলাকালে কাঁচপুর ব্রিজে বেগম জিয়ার গাড়িবহরে গুলির অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কুখ্যাত অধ্যায়।
তৎকালীন বিএনপি ও তৃণমূল কর্মীদের বক্তব্য অনুসারে—
স্থানীয় ক্ষমতাবান আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠ বাউন্ডারি ইকবালের অনুসারীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
যদিও এ বিষয়ে কোনো বিচারিক রায় নেই, তবুও বিএনপির রাজনৈতিক স্মৃতিতে এ ঘটনাটি এখনও ক্ষতচিহ্নের মতো অম্লান।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—
“ম্যাডামের গাড়িবহরে যে গুলির অভিযোগের পেছনে শামীম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠদের নাম ঘোরে, সেই পরিবার–ঘনিষ্ঠ প্রার্থীকে আজ কেন বিএনপি মনোনয়ন দিল ?”
দুবাই সফর ও ওসমান পরিবারের সঙ্গে ডিনার—দলের শোক, আর প্রার্থীর হাসি ?
মনোনয়ন পাওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে মুজিবুর রহমানের দুবাই সফরের সময় ওসমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ডিনার–টেবিলে হাসিমুখে তোলা ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
বিএনপি কর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন—
“দলের প্রতীক পাওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বিতর্কিত পরিবারের সঙ্গে ‘মধুর সম্পর্ক’? এটা কোন রাজনৈতিক অবস্থান ?”
এই ছবির কারণে তৃণমূলে তীব্র প্রশ্ন—
এমন ঘনিষ্ঠতা কি মনোনয়ন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো অঘোষিত ‘চুক্তি’ বা ‘লবি’ হিসেবে কাজ করেছে?
মনোনীত প্রার্থী বিষয়টি অস্বীকার করলেও কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন—
“যে পরিবারের বিরুদ্ধে বেগম জিয়ার ওপর হামলার অভিযোগ, তাদের সঙ্গেই হাসিমুখে ছবি—এটার ব্যাখ্যা কী ?”
পারিবারিক আওয়ামী রাজনীতি—ডিবি ঘনিষ্ঠতা—এমন পটভূমিতে BNP মনোনয়ন ?
স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে দাবি রয়েছে—মুজিবুর রহমানের পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সাথে যুক্ত হয়েছে ডিবির এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতা’–সংক্রান্ত অভিযোগ।
বিএনপির অনেক নেতা প্রকাশ্যে বলতে না পারলেও ব্যক্তিগত আলাপে জানান—
“এমন পটভূমির ব্যক্তিকে ধানের শীষ দেওয়া মানে তৃণমূলের চোখে ধুলো দেওয়া।”
ফখরুলের নামে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ—দলীয় মহলে ফিসফাস
বাউন্ডারি ইকবালের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের দাবি—
শতকোটির লেনদেনে মনোনয়নটি কেনা হয়েছে ।
এ অভিযোগে কেন্দ্রে আঙুল উঠেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দিকে।
যদিও তিনি বা দল আনুষ্ঠানিকভাবে এসবের কিছুই স্বীকার করেনি।
তবুও প্রশ্ন বাড়ছে—
দল যখন সংকটে,
নেত্রী মৃত্যুশয্যায়,
মাঠের কর্মীরা জেলে-রাস্তায় নিপীড়িত—
তখন লেনদেননির্ভর মনোনয়ন কি দলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয় ?
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে সরাসরি প্রশ্ন—তারেক রহমানের কাছে জবাব চান তৃণমূল
তৃণমূল নেতাকর্মীর প্রশ্ন—
“ম্যাডাম খালেদা জিয়া যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, ঠিক সেই সময়ে তার গাড়িবহরে গুলি করার অভিযোগ যাদের দিকে, তাদের ঘনিষ্ঠ মহলকে মনোনয়ন দেওয়া—এটি কি রাজনৈতিক নৈতিকতার অপমান নয় ?”
একজন সিনিয়র নেতা ক্ষোভভরে বলেন—
“এমন সিদ্ধান্তে মনে হচ্ছে দলকে ধ্বংসের জন্য কারা যেন ভিতর থেকে কাজ করছে।”
উপসংহার : বিএনপি কি নিজের ইতিহাসকেই অস্বীকার করল ?
কাঁচপুরে গুলির অভিযোগ, ওসমান পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, আর্থিক লেনদেনের গুজব—সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ এর মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপি অভ্যন্তরে যে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে তা এখন সর্বজনবিদিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
দলের এই সিদ্ধান্ত শুধু বিতর্কই নয়; এটি বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ইতিহাসের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
তৃণমূলের প্রত্যাশা—
জনাব তারেক রহমান ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব
এই বিতর্কের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেবেন,
নইলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হবে।









Discussion about this post