রূপগঞ্জ সংবাদদাতা :
সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ও নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সাবেক সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী (৭৭), তার সাবেক পিএস এমদাদুল হক (৫২) সহ মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে সিআইডি।
রূপগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া মামলার নম্বর ৪৩, তারিখ ১১/১২/২০২৫, ধারা—মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২)।
২৪শ শতাংশ জমি দখল–রূপান্তরের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে উঠে এসেছে—২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণা, চাঁদাবাজি, ভুয়া দলিল সৃজন ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মোট ২৪০১.৪৬ শতাংশ জমি অবৈধভাবে দখল, হস্তান্তর ও স্থানান্তর করেছে।
সরকারি বাজারদর অনুযায়ী এ জমির মূল্য ৮৬ কোটি ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬৪৪ টাকা।
এ চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা—যারা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষের জমি কাগজে-কলমে নিজের করে নিতে বছরের পর বছর অপারেশন চালিয়ে গেছে।
অভিযুক্তদের তালিকা
গোলাম দস্তগীর গাজী (সাবেক মন্ত্রী)
এমদাদুল হক (সাবেক পিএস)
সৈয়দা ফেরদৌসী আলম নীলা (সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান)
তোফায়েল আহমেদ আলমাছ (সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান)
মাহাবুবুর রহমান জাকারিয়া মোল্লা (আ. লীগ নেতা)
আনছার আলী
আলফাজ উদ্দিন
দিমন ভুঁইয়া
এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭–৮ জন তাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল বলে সিআইডির তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে।
ভুক্তভোগী মালিকদের জমির তালিকা
শাহ আলম, আব্দুস সোবহান, নাঈম প্রধান, হাসিনা বেগম, আলেয়া, ইয়াছিন প্রধান, সানজুরা বেগমসহ মোট ১৬ জন মালিকের জমি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণ মিলেছে।
ঘটনার গুরুতর দিক: আদালতের ক্রোকাদেশ
ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত ইতোমধ্যে মামলার সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছে (পিটি. নং ৬৮৪/২০২৫)।
ক্রোককৃত সম্পত্তির বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি টাকা—যা দেখায়, এই চক্র কতটা সুপরিকল্পিতভাবে সরকারি দাম, বাজারদর ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছে।
সিআইডি প্রধানকে এ সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে নিয়োগ করেছে আদালত—অর্থাৎ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে।
ওসি’র মন্তব্য : ‘সুসংগঠিত চক্র বহু বছর ধরে সক্রিয়’
রূপগঞ্জ থানার ওসি সাবজেল হোসেন জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিল।
তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু জমি দখল নয়—প্রতারণা, চাঁদাবাজি, দলিল জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানিলন্ডারিং–সবই রয়েছে।
কঠোর সমালোচনা: ক্ষমতার অপব্যবহারের চরম উদাহরণ
এই মামলাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ কীভাবে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করে—তার এক নগ্ন উদাহরণ।
একদিকে সাধারণ মানুষের জমি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ভুয়া দলিলের আড়ালে কোটি কোটি টাকা বৈধ সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে—মানুষের সম্পত্তি গিলে ফেলার এমন দুঃসাহস কেবল তখনই সম্ভব, যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ভয়ে, বাধায় বা চাপে দীর্ঘদিন নীরব থাকে।
সিআইডি এমন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস দেখিয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়:
এত বছর এ চক্র কীভাবে দাপটের সঙ্গে কাজ চালিয়েছে ? এত সম্পত্তি দখল হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন কোথায় ছিল ?
তদন্ত ও বিচার: রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা
এই মামলা এখন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা—
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কি তদন্ত বাঁধাগ্রস্ত হবে?
ভুক্তভোগীরা কি প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে?
জব্দকৃত শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি কি রাষ্ট্রের অধীনে সুরক্ষিত থাকবে?
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত শেষে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা।









Discussion about this post