নগর প্রতিনিধি :
জুলাই আন্দোলনে হামলা ও হত্যার অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি হয়েও প্রকাশ্যে অফিস ও ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন।
এনসিপি দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক শওকত আলী দাবি করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় ‘পলাতক’ থাকা সত্ত্বেও সেলিম ওসমান কোনো বাধা ছাড়াই নিয়মিত অফিস করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। প্রশাসন এসব জানলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না—কারণ হিসেবে তিনি বিএনপির একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর ‘শেল্টার’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
শনিবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শওকত আলী এসব অভিযোগ করেন। পোস্টটি প্রকাশের পরপরই রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
‘ওপেন সিক্রেট’ নাকি অদৃশ্য চুক্তি ?
শওকত আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে সেলিম ওসমানকে ঘিরে থাকা এই ‘রক্ষাকবচ’ কোনো গোপন বিষয় নয়। তিনি লেখেন, “এইগুলো নারায়ণগঞ্জের ওপেন সিক্রেট।” তবে কারা এই আশ্রয়দাতা—তা প্রকাশ্যে আনতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তার বক্তব্য, নাম বলার প্রয়োজন নেই, সবাই জানে।
এনসিপি নেতার এই অবস্থান রাজনৈতিক কৌশল নাকি চাপের ফল—সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নাম প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে এবং তার বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ শুরু হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় প্রশ্ন
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা নিয়ে। একজন ‘পলাতক আসামি’ যদি নিয়মিত অফিস ও ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি আদৌ স্বাধীনভাবে কাজ করছে ?
শওকত আলীর অভিযোগ অনুযায়ী, শুধু সেলিম ওসমান নন—নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলার আসামিও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোর্টপাড়ায় প্রভাবশালী আইনজীবীদের মাধ্যমে জামিন করানো হচ্ছে, এমনকি বৈষম্যবিরোধী মামলাতেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
বিএনপির পাল্টা অবস্থান
এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিএনপি নিজেই একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সেলিম ওসমানকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। তার ভাষায়, “সেলিম ওসমান বাংলাদেশেই আছে, চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বিএনপির কেউ যদি তাকে আশ্রয় দিয়ে থাকে—এমন তথ্য থাকলে এনসিপি নেতাদের তা প্রকাশ করা উচিত। নচেৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ বলেই এটি বিবেচিত হবে।
নির্বাচনের আগে বাড়ছে অস্বস্তি
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের চারটিতে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলেও চতুর্থ আসনটি এখনও স্থগিত। এই প্রেক্ষাপটে ‘শেল্টার’, ‘প্রক্সি রাজনীতি’ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আসন্ন নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগ শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়—বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। একজন পলাতক আসামি যদি প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকতে পারেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের আইনের প্রতি আস্থা কোথায় দাঁড়ায়?
প্রশ্ন থেকেই যায়
সেলিম ওসমান সত্যিই যদি পলাতক হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে সক্রিয় ? যদি প্রশাসন জানে, তাহলে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? আর যদি রাজনৈতিক আশ্রয়ই এর কারণ হয়—তাহলে আইন কি আদৌ সবার জন্য সমান?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি থাকবে সন্দেহ, শঙ্কা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।









Discussion about this post