যাদের জীবন দিয়ে পাওয়া স্বাধীনতা, অথচ আজ স্মৃতির পাতায়ও নেই আয়োজন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর এলেই দেশজুড়ে পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় রায়েরবাজার, মিরপুর বধ্যভূমি। বক্তৃতা হয়, প্রতিজ্ঞা উচ্চারিত হয়—কিন্তু নীরবে হারিয়ে যান অনেক নাম, অনেক জীবন, অনেক আত্মত্যাগ। সেই হারিয়ে যাওয়া নামগুলোর মধ্যেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা—যাদের কথা আজ নতুন প্রজন্ম জানেই না, চেনেই না।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো চূড়ান্ত না হলেও, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তালিকায় ৫৬১ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চারটি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই তালিকা প্রণয়ন করা হয়। সেই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের নাম এসেছে মাত্র পাঁচজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই পাঁচজনকে স্মরণ করে নারায়ণগঞ্জে আজও হয়নি কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক আয়োজন।
বিপ্লবের উত্তরাধিকার, চিকিৎসকের দায়িত্ব আর এক নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড
শহীদ ডা. হাসিময় হাজরা
ডা. হাসিময় হাজরা শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না, ছিলেন প্রতিবাদী চেতনার উত্তরাধিকার। ১৯৪৬ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া হাসিময়ের পরিবারে ছিল বিপ্লবের ঐতিহ্য। তাঁর চাচা অমৃত লাল হাজরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দ্বীপান্তরের শাস্তি ভোগ করেছিলেন। ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৪ সালে তোলারাম কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস—একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাঁর সামনে অপেক্ষা করছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেকেই তাঁকে ভারত যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন,
“বাংলাদেশের সবাই কি ওপারে যেতে পারবে ?”
ঢাকায় থেকে গোপনে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২ মে দুপুরে ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের উদ্দেশে রওনা দিয়ে আর ফেরেননি। পরে জানা যায়, রহমত বক্সারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করে। মরদেহ টুকরো টুকরো করে অজ্ঞাত স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। কোনো কবর নেই, কোনো স্মৃতিফলক নেই—শুধু ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।
হাসপাতাল ছাড়েননি, জীবনও রক্ষা হয়নি
শহীদ ডা. মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
ফতুল্লার কাশীপুর গ্রামের সন্তান ডা. মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ছিলেন মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া এই চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বেইরুট থেকে পাবলিক হেলথে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর সদর হাসপাতালে সহকারী সিভিল সার্জন হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পাকবাহিনী দিনাজপুর দখল করলে অনেকেই নিরাপদ স্থানে চলে গেলেও তিনি হাসপাতাল ছাড়েননি। আহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
২৯ এপ্রিল ১৯৭১—চিকিৎসার নাম করে তাঁকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর হাসপাতালের পাশের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হয় তাঁর দেহাবশেষ। চেহেলগাজী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হলেও, আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় খুব কম।
গৃহবন্দি অধ্যক্ষ, নিখোঁজ লাশ
শহীদ এ এফ জীয়াউর রহমান
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার নওগাঁ গ্রামের সন্তান এ এফ জীয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং সিলেট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখে। ইসলামাবাদে গিয়ে কাজ করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তিনি। ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ সকালে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। স্ত্রী-সন্তানদের বিদায় জানিয়েই বেরিয়ে যান—আর কোনো দিন ফেরেননি।
একজন মেধাবী চিকিৎসক, একজন শিক্ষক, একজন দেশপ্রেমিক—নিখোঁজের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায় তাঁর জীবন।
অজানা ইতিহাসের দুই নাম
ডা. লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আমিনুল হক ও শিক্ষক মতিলাল ঘোষ
ডা. লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আমিনুল হক ছিলেন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। ফতুল্লার ধর্মগঞ্জের এই সন্তানও শহীদ হন মুক্তিযুদ্ধের সময়।
অন্যদিকে, আড়াইহাজারের ঝাউগড়া গ্রামের প্রধান শিক্ষক মতিলাল ঘোষ—যিনি প্রজন্ম গড়ার দায়িত্বে ছিলেন—তিনিও হারিয়ে যান হানাদারদের হাতে।
এই দুই শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আজও অপ্রতুল। যেন ইতিহাস নিজেই তাঁদের ভুলে গেছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়
নারায়ণগঞ্জ কি তাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ভুলে গেছে ?
নাকি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই স্মৃতিকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলছি ?
যে শহরের মানুষ জীবন দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিলেন, সেই শহরেই যদি তাঁদের স্মরণে কোনো আয়োজন না হয়, কোনো স্মৃতিফলক না থাকে—তবে ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছাবে কীভাবে ?
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা শুধু অতীত নন—তাঁরা আমাদের বিবেক।
আর সেই বিবেককে ভুলে যাওয়া মানেই, ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।









Discussion about this post