নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীর ওপর গুলির ঘটনা এবং তার ঠিক আগের সপ্তাহে দেশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে দ্রুত স্থানান্তরের ঘটনা—এই দুইয়ের মধ্যকার সময়গত যোগসূত্র নতুন করে প্রশ্ন ও রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
ওসমান হাদীর ওপর গুলি করা হয় শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে। এর ঠিক সাত দিন আগে, ৫ ডিসেম্বর, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সুব্রত বাইন ওরফে মোহাম্মদ ফতেহ আলীকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
কারাগারের ভেতরের অভিযোগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
কারা সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ মে ঢাকার তেজগাঁও এলাকা থেকে সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সুব্রত বাইনকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস বন্দি ছিলেন।
এই সময়ের মধ্যে কারাগারের ভেতর থেকে তথ্য পাচার, অবৈধ যোগাযোগ এবং অনিয়মমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে সুব্রত বাইনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের একাধিক কারারক্ষীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কারা অধিদপ্তর, যা কারা প্রশাসনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অজ্ঞাত কারণ দেখিয়ে দ্রুত স্থানান্তর
এরপর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই এবং গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে ৫ ডিসেম্বর দ্রুততার সঙ্গে সুব্রত বাইনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটে ওসমান হাদীর ওপর গুলির ঘটনা।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সুব্রত বাইন নারায়ণগঞ্জ কারাগারে থাকা অবস্থায় যেসব অনিয়ম ও তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোর সূত্র এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে তার আকস্মিক স্থানান্তর এবং পরবর্তী সহিংস ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
গুলির ঘটনার পর গ্রেপ্তার ও সন্দেহভাজনদের নারায়ণগঞ্জ যোগাযোগ
ওসমান হাদীকে গুলি করার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে ১৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার অন্যতম আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবিরকে। এর আগে ফয়সালকে গ্রেপ্তারের জন্য র্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার দল নারায়ণগঞ্জে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে।
ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও তার স্ত্রী শাহিদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু এবং মারিয়া আক্তার লিমাকে গ্রেপ্তার করতে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের ফতুল্লা থানাধীন দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকার তানভীরের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালানো হয়।
এদিকে গুলির ঘটনার তিন থেকে চার দিন আগেও ফয়সাল করিম মাসুদ নারায়ণগঞ্জে আসা–যাওয়া করেছেন—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, যা তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক যোগসূত্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
সুব্রত বাইনের কারাগার অবস্থান, তার দ্রুত স্থানান্তর, ওসমান হাদীর ওপর গুলির ঘটনা এবং মামলার আসামিদের নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় উপস্থিতি—সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহ নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক এক গভীর নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ সদর আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান ওরফে ‘মডেল মাসুদ’ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন না করার ঘোষণা দেন। এতে করে নির্বাচনের মাঠে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সৃষ্টি হয়েছে নতুন করে চাপ ও অস্বস্তি।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত
ওসমান হাদীর ওপর গুলির ঘটনার সঙ্গে সুব্রত বাইনের স্থানান্তরের কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। তবে সময়কাল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান ও নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক তৎপরতা একত্রে বিচার করলে বিষয়টি নিছক কাকতালীয় নয় বলেই মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনে প্রশাসনের গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post