ফেরি চলাচল বন্ধ # ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নরসিংপুর এলাকা থেকে ধলেশ্বরী নদী পারাপারের সময় একটি মর্মান্তিক ফেরি দুর্ঘটনায় ট্রাকসহ পাঁচটি যানবাহন নদীতে পড়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকে ওই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় দুই পাড়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) বিকেল পর্যন্ত নদীতে পড়ে যাওয়া যানবাহন উদ্ধারের কাজও শুরু হয়নি।
দুর্ঘটনার বিবরণ :
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার (২০ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংপুর ঘাট থেকে ছেড়ে আসা একটি ফেরি বক্তাবলী ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মাঝ নদীতে পৌঁছালে ফেরিতে থাকা একটি ট্রাক হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায়। ট্রাকটি সামনে থাকা দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, একটি মোটরসাইকেল ও একটি ভ্যানকে ধাক্কা দিলে ফেরির রেলিং ভেঙে যায়। এতে ট্রাকসহ পাঁচটি যান সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে পড়ে যায়।
উদ্ধার অভিযান ও প্রাণহানি
ঘটনার খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। রাত ২টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর আর কেউ নিখোঁজ আছে কি না—তা নিশ্চিত না হওয়ায় তল্লাশি কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
নিহতরা হলেন—
মোটরসাইকেলচালক মো. রফিক (৩৫)
ভ্যানচালক মো. স্বাধীন (২৫)
সিঙ্গাপুরপ্রবাসী মাসুদ রানা (৩০)
স্বজনদের আহাজারি
নিহত প্রবাসী মাসুদ রানার মা পারভিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“২৫ দিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এসেছে আমার ছেলে। ড্রাইভিং শিখছিল। শনিবার রাতে ফেরিতে উঠেছে বলে স্ত্রীকে ফোন দেয়। এরপর আর ফোন পাওয়া যায়নি। রাত ২টায় ছেলের লাশ নিয়ে ফিরেছি।”
অন্যদিকে নিহত রফিকের স্ত্রী পিংকি জানান, “আমি স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে মোটরসাইকেলে বাবার বাড়ি যাচ্ছিলাম। ট্রাক ধাক্কা দিলে আমি ও সন্তানরা ফেরিতে পড়ে যাই, কিন্তু স্বামী ট্রাকসহ নদীতে পড়ে যায়। পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।”
ফেরি চলাচল বন্ধ, স্থবির বাণিজ্য
রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর দুই পাড়ে ভারী যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বক্তাবলী ও নরসিংপুর এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব হোসেন ফকির বলেন, “মানুষের প্রাণ গেল, অথচ এখনো যানবাহন উদ্ধার হয়নি। ফেরি বন্ধ থাকায় পুরো এলাকা অচল হয়ে আছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম বলেন,
“ফেরি চালককে এখনো পাওয়া যায়নি। কেউ নিশ্চিতভাবে নদীতে যান ডোবার সুনির্দিষ্ট স্থান দেখাতে পারেনি। নদীর গভীরতা ও অবস্থান শনাক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ ফেরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আলাল হোসেন জানান,
“দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আশা করছি, আজ বিকেলের মধ্যে চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।”
মামলা নেই, চালক পলাতক
এ ঘটনায় রোববার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, “দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাইমা ইসলামকে প্রধান করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নাইমা ইসলাম বলেন, “দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকচালক পলাতক। আমরা ঘটনাস্থল ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। যানবাহন উদ্ধারের উপায়সহ সার্বিক বিষয় তদন্তাধীন রয়েছে।”









Discussion about this post