নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিল্পখাতে গ্যাস চুরি যেন এক নীরব কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অপরাধ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সেই অপরাধেরই একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ—ক্রোনী অ্যাপারেলস ও অবন্তী কালার টেক্সের মালিক, বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এএইচ আসলাম সানী।
গ্যাস চুরির মামলায় দীর্ঘদিন আদালতে অনুপস্থিত থাকায় এবার তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপের পথে হেঁটেছে বিচার বিভাগ।
গত শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আসলাম সানীকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে – নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাজির না হলে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, আইনি বাধ্যবাধকতা
আদালত সূত্রে জানা যায়, আসলাম সানীর বিরুদ্ধে ২০১০ সালের গ্যাস আইন অনুযায়ী ধারা ১০(১)(গ) ও ১২(১) এর আওতায় মামলা দায়ের হয় ফতুল্লা মডেল থানায়। মামলার পর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে আদালতের কার্যক্রম এড়িয়ে চলেছেন। একাধিকবার সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৩৩৯-বি (১) ধারা প্রয়োগ করে আদালত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়—যা সাধারণত পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা আসামিদের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গ্যাস চুরির কৌশল ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতি
মামলার এজাহার ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আসলাম সানীর মালিকানাধীন রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান অবন্তী কালার টেক্স-এ অবৈধভাবে উচ্চক্ষমতার বুস্টার মেশিন ব্যবহার করে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছিল।
চলতি বছরের ১০ মার্চ তিতাস গ্যাসের একটি বিশেষ টিম অভিযানে গিয়ে এই চুরির প্রমাণ পায়। পরবর্তীতে গ্যাস সংযোগ সিলগালা করা হয়। অভিযানের পর নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক লিটিগেশন ও পিআর শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান পাঠান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
মামলায় উল্লেখ করা হয়—
১. আসলাম সানীর প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০ কোটি ১২ লাখ টাকা গ্যাস বিল বকেয়া ছিল
২. বকেয়া পরিশোধ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়
৩. এরপর তিনি অবৈধ বুস্টার ব্যবহার করে পুনরায় গ্যাস চুরি শুরু করেন
৪. এই চুরির ফলে সরকার প্রায় ৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হয়
প্রভাবশালী পরিচয় ও দায় এড়ানোর অভিযোগ
আসলাম সানী শুধু একজন শিল্পপতি নন, তিনি ছিলেন বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি—যা তাকে শিল্পখাতে প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালেই তিনি দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক দফায় গ্যাস চুরির মতো গুরুতর অপরাধ চালিয়ে গেছেন এবং মামলা দায়েরের পর পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
বড় প্রশ্ন : আইনের শাসন কোথায় ?
একদিকে সরকার যখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গ্যাস চুরির মতো অপরাধ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আসলাম সানীর মামলা সেই বাস্তবতারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
এখন দেখার বিষয়—পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির পর আসলাম সানী আদালতে হাজির হন, নাকি অনুপস্থিত থেকেই বিচার সম্পন্ন হওয়ার নজির তৈরি হয়।









Discussion about this post