নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। খুন, গুম, অপহরণ, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের তালিকা এখানে পুরনো। একাধিকবার র্যাব ও পুলিশের ওপর হামলা ও গুলির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এবার সেই ভয়াবহ চিত্র আরও নগ্নভাবে সামনে এলো—অপহরণ ও গুমের প্রতিবাদে মানববন্ধনে অংশ নেওয়ায় দুই যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করার চেষ্টা।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় ফতুল্লার ইসদাইর এলাকার রাবেয়া স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটি কুকুরের মুখে বিদ্ধ হয়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান রানা ও অন্তর নামে দুই বন্ধু।
মানববন্ধনের ‘অপরাধ’, সন্ধ্যায় গুলির জবাব
ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রেক্ষাপট আরও উদ্বেগজনক। রানার বাবা রিপন জানান, ইসদাইর এলাকায় নজরুল ইসলাম ও মোবারক নামে দুই ব্যক্তি দুই মাসেরও বেশি সময় আগে অপহরণের পর নিখোঁজ হন। পরিবারগুলোর দাবি, এটি গুমের ঘটনা। পুলিশ এখনো তাদের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।
রিপনের অভিযোগ, “এই ঘটনায় জড়িত মাদক ব্যবসায়ী রাজ্জাক বাহিনীর কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও তাদের গুরুত্বসহকারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার সকালে আমার ছেলে রানা ও তার বন্ধু অন্তরসহ নিখোঁজদের পরিবার নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেয়।”
সেই মানববন্ধনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধ্যায় ভয়াবহ প্রতিশোধের চিত্র দেখা যায়।
৩০–৩৫ জনের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার দিকে রানা ও অন্তর ইসদাইরে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে ৩০–৩৫ জন দুর্বৃত্ত এলাকায় মহড়া দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা রানার সামনে পড়ে গেলে সরাসরি লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়া হয়।
গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশে থাকা একটি কুকুরের মুখে বিদ্ধ হয়। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে রানা ও অন্তর আশপাশের গলিপথ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান।
অপরাধীরা এতটা সাহসী কেন ?
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—দিনের আলোতে মানববন্ধন, সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে গুলি—এত বড় দুঃসাহস আসে কোথা থেকে ?
ইসদাইর রেললাইন এলাকাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি,
# এখানে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয় সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে
# অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযোগ করলেও ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা পান না
# গ্রেফতার হলেও অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে
# ফলে প্রতিবাদ করাই হয়ে ওঠে ‘ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধ’
পুলিশের বক্তব্য, প্রশ্ন রয়ে যায়
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আব্দুল মান্নান বলেন, “খবর পেয়ে ইসদাইর এলাকায় চারদিক ঘিরে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযান এখনো চলছে।”
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—অভিযান কেন সব সময় ঘটনার পর? অপরাধ ঠেকাতে আগাম গোয়েন্দা তৎপরতা কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা নাকি নীরবতা ?
এই ঘটনা শুধু একটি গুলির চেষ্টা নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গভীর সংকেত।
যেখানে—
# গুমের অভিযোগে দুই মাসেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
# প্রতিবাদে অংশ নেওয়াই হয়ে ওঠে প্রাণনাশের কারণ
# প্রকাশ্যে গুলি হলেও হতাহতের আগেই ঘটনাটি চাপা পড়ার শঙ্কা থাকে
সেখানে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হচ্ছে।
শেষ কথা
ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন আজ কেবল একটি এলাকা নয়—এটি আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার প্রতীক।
যদি প্রকাশ্যে গুলি, মানববন্ধনে অংশ নেওয়াই ‘অপরাধ’ হয়—তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই শহরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় ?
এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, গুমের অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক ভাঙতে কার্যকর অভিযান এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post