নিজস্ব প্রতিবেদক :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে মনোনয়নপত্র ক্রয়ের হিড়িক নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) জেলা নির্বাচন অফিস থেকে একদিনেই ২৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন—যাদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, ধর্মভিত্তিক দল, বাম দল ও বিপুল সংখ্যক তথাকথিত ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী।
স্বতন্ত্রের ভিড়ে দলীয় রাজনীতির ছায়া
অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীদের বড় একটি অংশ সরাসরি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন ও তার ছেলে গোলাম মোহাম্মদ কায়সার। বাবা-ছেলে উভয়েই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র ক্রয় করলেও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি দেখা হচ্ছে পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, দলীয় মনোনয়ন অনিশ্চিত হওয়ায় কিংবা ভবিষ্যৎ দরকষাকষির অংশ হিসেবেই ‘স্বতন্ত্র’ পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। একই কৌশল অনুসরণ করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির। তিনিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন কিনেছেন, যা ক্ষমতাসীন দলের ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও অনাস্থার ইঙ্গিত দেয়।
পরিবারতন্ত্র ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস
গিয়াস উদ্দিন পরিবারের রাজনীতিতে একাধিক সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন নয়। তবে একই আসনে বাবা ও ছেলের একসঙ্গে মনোনয়নপত্র সংগ্রহকে অনেকেই দেখছেন পরিবারতন্ত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। স্থানীয় ভোটারদের প্রশ্ন—রাজনীতি কি আদর্শের, নাকি উত্তরাধিকার ও নিয়ন্ত্রণের হাতবদলের খেলা ?
একইভাবে একাধিক বিএনপি নেতা, যুবদল ও থানা পর্যায়ের নেতাদের মনোনয়ন সংগ্রহ দলটির ভেতরে চরম বিভক্তির চিত্র তুলে ধরেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত আদৌ মাঠপর্যায়ে কার্যকর কি না—সে প্রশ্নও উঠছে।
ধর্মীয় ও ছোট দলের হঠাৎ সক্রিয়তা
খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামা, ইসলামি আন্দোলন, বাসদ, জাসদ, এনসিপি, কমিউনিটি পার্টিসহ বহু ছোট ও ধর্মভিত্তিক দলের প্রার্থীদের একযোগে মনোনয়ন সংগ্রহকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন দরকষাকষির রাজনীতি হিসেবে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে গিয়ে এসব প্রার্থীর অনেকেই বড় দলের পক্ষে সরে দাঁড়াবেন—এমন নজির অতীতেও রয়েছে।
ভোটাররা যেখানে অনুপস্থিত
মনোনয়ন দৌড়ে যেখানে প্রার্থীর ছড়াছড়ি, সেখানে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেই কোনো উৎসাহ বা আলোচনার উত্তাপ। ফতুল্লার একাধিক ওয়ার্ডে কথা বলে জানা গেছে, নাগরিক সমস্যা, অপরাধ, দখল, মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রার্থীর সুস্পষ্ট অবস্থান এখনো দৃশ্যমান নয়।
একজন স্থানীয় প্রবীণ ভোটারের মন্তব্য,“মনোনয়ন কিনলেই যদি জনপ্রতিনিধি হওয়া যায়, তাহলে ভোটের দরকার কী ?”
প্রশ্নের মুখে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা
২৬ জন মনোনয়নপত্র ক্রয়ের ঘটনা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে। এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর যাচাই-বাছাই, আচরণবিধি মানা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মনোনয়নপত্র গ্রহণকারীরা হলেন :
এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন, কমিউনিটি পার্টির ইকবাল হোসেন, জমিয়তে উলামায়ের মনির হোসেন কাসেমী, ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু, জাসদের সোলাইমান দেওয়ান, গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভুইয়া, স্বতন্ত্র ডা. আলী আশরাফ খান, জামায়াত ইসলামের আব্দুল জব্বার, স্বতন্ত্র মাহফুজুর রহমান নাঈম,আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির ছাড়াও স্বতন্ত্র থেকে বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন, তার ছেলে গোলাম মোহাম্মদ কায়সার, মমিনুল হক, জহিরুল ইসলাম, বিএনপির সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, বিএনপি নেতা শাহ আলম, খেলাফত মসলিসের ইলিয়াস আহমেদ, বাসদ এর সেলিম মাহমুদ, স্বতন্ত্র সেলিম রেজা (শাওন), আবু হানিফ হৃদয়, খেলাফত মজলিস থেকে আনোয়ার হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সুরাইয়া তাবাসসুম, ইসলামি আন্দোলনের ইসমাইল হোসেন কাউসার, বিএনপির সুরুজ্জামান, স্বতন্ত্র কবির হোসেন, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়নপত্র ক্রয়ের এই হঠাৎ বিস্ফোরণ আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতা, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সমঝোতার রাজনীতিকেই স্পষ্ট করছে। ‘স্বতন্ত্র’ নামের আড়ালে দলীয় হিসাব-নিকাশ, পরিবারতন্ত্র ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ যদি শক্তভাবে খতিয়ে দেখা না হয়, তবে এই নির্বাচন স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।









Discussion about this post