নিজস্ব প্রতিবেদক :
ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল আলম সেন্টুকে ঘিরে বিএনপির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত শুধু দলীয় নয়, বরং নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ঘোষণা, আবার তা স্থগিত—এই টানাপোড়েনের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ক্ষমতার পালাবদলে অবস্থান বদলের পুরনো গল্প।
বহিষ্কার প্রত্যাহার না স্থগিত—কী ঘটেছিল ?
গত ১ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মনিরুল আলম সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়। মুহূর্তেই বিষয়টি নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
এর দুই দিন পর, শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাতে নতুন এক চিঠিতে জানানো হয়—ভুলবশত ওই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, বাস্তবে সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ বহাল থাকবে। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদও একই কথা নিশ্চিত করেন।
নৌকার প্রচার থেকে নৌকার চেয়ারম্যান
বিএনপির দলীয় নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পক্ষে নৌকা প্রতীকে ভোট চাওয়ার অভিযোগে মনিরুল আলম সেন্টুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর ২০২১ সালের ৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড থেকে কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পান তিনি। সেই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকেই জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান হন সেন্টু।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল দলবদল নয়, বরং ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবস্থান বদলের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ফতুল্লাবাসীর অভিযোগ: ভয়, দখল আর চাঁদাবাজি
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শামীম ওসমানের রাজনৈতিক প্রভাব তুঙ্গে থাকাকালে মনিরুল আলম সেন্টুর কর্মকাণ্ড নিয়ে ফতুল্লা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক
কর্মীদের অভিযোগ—
# ভূমি দখল ও জমি সংক্রান্ত জোরজবরদস্তি
# ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়
ভিন্নমত দমন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন
অভিযোগ রয়েছে, শাহ নিজাম নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হতো। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সেন্টুর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সরকার বদল, সুর বদল
২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেন্টুর অবস্থানেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতা থেকে সরে এসে তিনি আবার বিএনপির পক্ষে সক্রিয় হতে শুরু করেন—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যেই।
তাদের প্রশ্ন, “যে ব্যক্তি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে চেয়ারম্যান হয়েছেন, তিনিই কীভাবে আবার বিএনপির রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য হন ?”
বিএনপির সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন
বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখার মাধ্যমে বিএনপি আপাতত বিতর্ক সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনাটি দলটির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
# সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত নেতাদের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নিলে তৃণমূলের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে
# অতীতের অভিযোগ আমলে না নিয়ে পুনর্বাসনের ইঙ্গিত দলীয় শুদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে
শেষ কথা
মনিরুল আলম সেন্টুকে ঘিরে বহিষ্কার বহাল থাকলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ক্ষমতার পালাবদলে যারা বারবার রঙ বদলায়, তাদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা কঠোর হবে ?
ফতুল্লার কুতুবপুরবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে উঠে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে, বিতর্কিত রাজনীতির চক্র ভাঙবে না। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ব্যক্তির নয়—নীতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।









Discussion about this post