নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানী ঢাকায় র্যাব পরিচয়ে নারায়ণগঞ্জের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারীকে অপহরণ করে ৮০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন, গুঞ্জন ও রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বর্ণ ব্যবসায়ী মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজার স্বর্ণপট্টির ‘হাজী জুয়েলারী’র দুই কর্মচারী মোজাম্মেল হক হুমায়ুন (৫৫) ও ফজলে রাব্বি (৪৮) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম স্বর্ণ শিল্পালয়ে স্বর্ণ বিক্রি শেষে নগদ ৮০ লাখ টাকা নিয়ে ‘শ্রাবণ পরিবহন’ নামের একটি বাসে নারায়ণগঞ্জে ফিরছিলেন।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাসটি মাতুয়াইল এলাকায় পৌঁছালে একটি সাদা মাইক্রোবাস চলন্ত বাসটির গতিরোধ করে।
এরপর কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের র্যাব পরিচয় দিয়ে ওই দুই কর্মচারীকে টাকার ব্যাগসহ নামিয়ে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে তাদের মারধর করে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ সেতুর নিচে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। আহত অবস্থায় স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হয়ে তারা পুলিশি হেফাজতে যান এবং চিকিৎসা নেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) মো. ইমরান আহম্মেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
তদন্তে ‘গরমিল’, রহস্যের গুঞ্জন
তবে ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অপহৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে তদন্তকারীদের কাছে কিছু ‘গরমিল’ ধরা পড়েছে। ঠিক কী ধরনের অসঙ্গতি—সে বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হয়নি। তবে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশসহ একাধিক সংস্থা নীরবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই রহস্যজনক নীরবতাই কালিরবাজার স্বর্ণপট্টিতে নতুন করে আগুনে ঘি ঢেলেছে। অনেক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি শুধুই র্যাব পরিচয়ে ছিনতাই, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো গল্প?
পুরনো ঘটনা, নতুন প্রশ্ন
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—হাজী জুয়েলারীর মালিক মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে এর আগেও ডিবি পরিচয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছিল, যা সে সময় মামলা না করেই ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কয়েক মাস আগে ৩০ লাখ টাকা সংক্রান্ত আরেকটি ঘটনায়ও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ব্যবসায়ী।
কালিরবাজার স্বর্ণপট্টির একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, এখানে একের পর এক বড় অঙ্কের অর্থ সংক্রান্ত ‘অঘটন’ ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রকাশ্যে আসে না। কখনো ভয়, কখনো সমঝোতা, আবার কখনো রহস্যজনক নীরবতার কারণে এসব ঘটনা চাপা পড়ে যায়।
প্রকৃত ব্যবসায়ীদের শঙ্কা
স্বর্ণপট্টির প্রকৃত ও নিয়মিত ব্যবসায়ীরা বলছেন, বারবার এমন ঘটনায় পুরো বাজারের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধী ধরা না পড়লে সাধারণ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
তাদের প্রশ্ন—যদি বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে এমন ঘটনা ঘটে, তবে কারা এসব তথ্য পাচ্ছে? আর কেনই বা বড় অঙ্কের ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়মিত মামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে না?
শেষ কথা
কালিরবাজার স্বর্ণপট্টি নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেখানে বারবার রহস্যজনক ছিনতাই, অপহরণ ও নীরবতার সংস্কৃতি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার প্রশ্নই নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অস্বচ্ছতার দিকেও ইঙ্গিত করে।
এখন দেখার বিষয়—এই ৮০ লাখ টাকার ঘটনার তদন্ত কি সত্যিই সব প্রশ্নের জবাব দেবে, নাকি আগের ঘটনাগুলোর মতো এটিও হারিয়ে যাবে নীরবতার অন্ধকারে।









Discussion about this post