নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতি, অপরাধ এবং নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে একটি ছাত্রদল নেতার পৈতৃক বাড়ি থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—লুট হওয়া রাষ্ট্রীয় অস্ত্র কীভাবে রাজনৈতিক বলয়ের আশ্রয়ে পৌঁছাল ?
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ভোরে মেঘনা নদীবেষ্টিত কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে চালানো বিশেষ অভিযানে আড়াইহাজার থানা থেকে গত বছর গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া একটি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৫ রাউন্ড শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়।
একইসঙ্গে আটটি ককটেল, ইলেকট্রিক শটগান, চায়নিজ কুড়ালসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, মাদক, নগদ ১০ লাখ টাকা ও একাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (গ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম জানান, “কালাপাহাড়িয়ার কদমীরচর এলাকার কাশেম আলীর পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয় এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে অভিযানের পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, কাশেম আলী আড়াইহাজার উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোবারক হোসেনের পিতা।
মোবারক হোসেন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও দলীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল আজাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এই প্রেক্ষাপটে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের রাজনৈতিক সংযোগ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
অভিযান শেষে বিকেলে খালিয়ার চর জাহানারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল যোবায়ের আলম বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ দমনে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ১৪০ জন সেনা ও ১০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নেন।”
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—খালিয়ার চরের এরশাদের ছেলে মো. জাকির (৩০), কানাই মিয়ার ছেলে মো. জনি (১৯), প্রয়াত হযরত আলীর ছেলে মো. স্বপন (৪০), শামসুল হক ব্যাপারীর ছেলে আব্দুল মতিন (৪৫) ও শুকুর আলীর ছেলে রিন্টু মিয়া (৫১)।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল যোবায়ের আলম বলেন, ‘কালাপাহাড়িয়া অঞ্চলটি চারপাশে নদী দিয়ে বেষ্টিত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নজরদারিতে এখানে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভোর সাড়ে পাঁচটায় অভিযান শুরু করে এলাকার নদীপথ, বহির্গমন পথ ও বসতবাড়ি ঘিরে ফেলা হয়।’
তিনি আরও বলেন, “এই অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের আশ্রয়স্থল শনাক্ত করা হয়েছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এতে অপরাধমূলক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আমরা আশা করছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সাফল্যের পাশাপাশি গুরুতর প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—রাষ্ট্রীয় অস্ত্র লুট হয়ে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় পেল ? কারা এই অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করছিল এবং নির্বাচনকে ঘিরে এর উদ্দেশ্য কী ছিল ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা না গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটবে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।









Discussion about this post