নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জে কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক বেদনাদায়ক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কেঁপে ওঠে পুরো জেলা। খুন, নারী হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি এবং ডাকাত আতঙ্ক—সব মিলিয়ে একটি দিন যেন নগরবাসীর মনে নিরাপত্তাহীনতার গভীর ছাপ রেখে গেছে।
ভোরে লাশ উদ্ধার, শুরু চাঞ্চল্য
দিনের শুরুতেই শহরের ফকিরটোলা এলাকায় একটি যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শুক্রবার ভোরে ফকিরটোলা মসজিদের পাশ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, রাতের কোনো এক সময়ে তাকে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছে। তবে কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানায়, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং পরিচয় শনাক্ত ও ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
এই ঘটনা শহরজুড়ে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই দুপুর গড়াতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
রূপগঞ্জে গৃহবধূ হত্যাকাণ্ড ও অভিযুক্তের গণপিটুনি
দুপুরের পর রূপগঞ্জে ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। দুই সন্তানের জননী আমেনা বেগমকে গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করেন টাইলস মিস্ত্রি মেহেদী হাসান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই অভিযুক্ত মেহেদী হাসানকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এলাকাবাসী এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই আসে আরও ভয়াবহ খবর—হাসপাতালে নেওয়ার পর আমেনা বেগম মারা গেছেন।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত জনতা পুলিশের হেফাজত থেকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় মেহেদী হাসানকে ছিনিয়ে নেয়। এরপর প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
এই ঘটনায় একদিকে যেমন একজন গৃহবধূ প্রাণ হারালেন, অন্যদিকে আইনের হেফাজত থেকে একজন অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রাতে ডাকাত আতঙ্ক ও গণপিটুনি
দিনের শেষভাগেও শান্ত হয়নি নারায়ণগঞ্জ। রাতের দিকে সোনারগাঁয়ের হাইওয়ে সড়কে ডাকাত আতঙ্ক নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। সম্প্রতি মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে ডাকাতির ঘটনায় দেশজুড়ে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় স্থানীয়রা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
শুক্রবার রাতে সন্দেহভাজনদের আটক করে এলাকাবাসী। সিএনজি চালিয়ে পালানোর সময় সাতজনকে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহত অবস্থায় ডাকাত সন্দেহে সাতজনকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
অনুসন্ধান ও প্রশ্ন
একই দিনে একাধিক হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি ও ডাকাত সন্দেহে মারধরের ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—নারায়ণগঞ্জে জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ দমনে ব্যর্থতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। তবে গণপিটুনি কোনোভাবেই সমাধান নয়; বরং এতে অপরাধ আরও বাড়ে এবং নিরপরাধ মানুষও প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেকটি ঘটনায় তদন্ত চলছে। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপসংহার
শুক্রবারের ঘটনাবহুল দিন নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন রেখে গেছে—এই নগর কি আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে ? অপরাধ, প্রতিশোধ ও জনরোষের এই ভয়ংকর চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।








Discussion about this post